পবিত্র দেশ ইজরায়েল : ছবি ধর

 
পবিত্র দেশ  ইজরায়েল 
 
 ছবি ধর

ইজরায়েল পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্র। এটি ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব তীরে ও লোহিত সাগরের উত্তর তীরে অবস্থিত। দেশটির উত্তর স্থলসীমান্তে লেবানন, উত্তর-পূর্বে সিরিয়া, পূর্বে জর্দান ও ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত ভূখন্ড পশ্চিম তীর, পশ্চিমে ফিলিস্তিনি ভূখন্ড গাজা উপত্যকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশর অবস্থিত। ইজরায়েল এমন একটি দেশ যার জনসংখ্যাতে  নারীদের  সংখ্যাই  বেশী আবার প্রায় সব মেয়েরাই এখানে উন্নত  স্তরের  মালিক শ্রেণীতে  কর্মরত l


সমগ্র ইসরায়েলই  রাজধানী হিসাবে জেরুসালেম শহরকে  রাজধানী হিসেবে দাবী করে আসছে, যদিও এই মর্যাদা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রই স্বীকার করে না। শহরের পশ্চিমভাগ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং এখানে দেশটির সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলি অবস্থিত।অর্থনৈতিকভাবে ইসরায়েল একটি অত্যন্ত উন্নত শিল্পপ্রধান রাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত তেল আভিভ দেশটির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রাণকেন্দ্র এবং বৃহত্তম নগর এলাকা lস্থুল আভ্যন্তরীণ উৎপাদনেরহিসেবে ইসরায়েল বিশ্বের ৩৪তম বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার সদস্যরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে এটি এশিয়ার ৩টি উচ্চ-আয়ের রাষ্ট্রগুলির একটি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে এটি বিশ্বের ৩৯টি অগ্রসর অর্থনীতিসমৃদ্ধ দেশগুলির একটি।

ইসরায়েলে প্রায় ৮৩ লক্ষ লোকের বাস। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ; এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৮১ জন অধিবাসী বাস করে। এদের মধ্যে ৬১ লক্ষ ইহুদীজাতি ও ধর্মাবলম্বী এবং ১৭ লক্ষ আরব জাতিভুক্ত (যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান)। এটিই বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে ইহুদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়। ইসরায়েলের জনগণ অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত; এখানকার প্রায় অর্ধেক জনগণের (২৫-৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে) বিশ্ববিদ্যালয় বা তার সমপর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে, যা বিশ্বের ৩য় সর্বোচ্চ।দেশটির জীবনযাত্রার মান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ, এশিয়াতে ৫ম এবং বিশ্বে ১৯তম।


ইসরায়েল নিজেকে একটি ইহুদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবী করে। এখানে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। এর এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নাম ক্নে‌সেত। প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

ইসরায়েলের জন্ম, ইতিহাস ও রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই ইসরায়েল প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলির সাথে বেশ কয়েকবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দেশটি ১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা সামরিকভাবে দখল করে আছে। বর্তমানে পৃথিবীর ১৬১টি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ৩১টি রাষ্ট্র (মূলত মুসলমান অধ্যুষিত) এখনও ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়নি এবং দেশটির সাথে তাদের কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তাদের অনেকের মতে ইসরায়েল স্বাধীন রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের একটি অংশের অবৈধ দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড। তবে নিকটতম দুই আরব প্রতিবেশী মিশর ও জর্দানের সাথে ইসরায়েল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছে ও দেশ দুইটির স্বীকৃতিও লাভ করেছে।


ইহুদীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর এবং মুসলিম ও খ্রিস্টানদেরও গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হল জেরুজালেম শহর। জেরুজালেমের ইহুদী মন্দির ও পশ্চিম দেওয়াল বিখ্যাত। এছাড়া আছে যিশুখ্রিস্টের জন্মস্থান বেথেলহেম, বাসস্থান নাজারেথ।এখানে হারাম আল শরীফ তথা আল-আকসা মসজিদ অবস্থিত।ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ যা মুসলিমদের প্রথম কিবলা হিসাবে পরিচিত।

137 টি  সমুদ্র সৈকত অবস্থিত l
ভূমধ্যসাগরের তীর জুড়ে রয়েছে অনেক অবকাশ যাপন কেন্দ্র। আরও আছে লবণাক্ত মৃত সাগর, যার জলে  ভেসে থাকা যায়। লোহিত সাগরের উপকূল এবং গ্যালিলির সাগরের উপকূলেও অনেক অবকাশ কেন্দ্র রয়েছে l

ইসরাইল সম্পর্কে অনেকেরই জানার কৌতুহল রয়েছে। দেশটি জন্মের শুরু থেকেই অন্য সাধারণ রাষ্ট্রের চাইতে বেশ কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারি।
ইসরাইলের জাতীয় পাখি ‘হুপো’।  তাছাড়াও ‘এলেট’ এবং ‘হুলা ভ্যালি’ বিশ্বের সেরা পাখি দর্শনের স্থানগুলির একটি।
ইসরাইলের স্টেম-সেল প্রযুক্তির কারণে আমেরিকার হার্টের টিস্যু পুনর্জন্ম সম্ভব হয়েছে! যা চিকিৎসাকে আরো উন্নত করে দিয়েছে।

ইসরাইলে এমন একটি রান্নার তেল আবিষ্কার হয় যা কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য রক্তের ফ্যাট ভাঙ্গার ক্ষমতা রাখে।
 ইসরাইলের আইনজীবীদের  ৪৪% এর বেশি মহিলা।

ইসরাইলের আয়তন----
 ১৯৪৯ সালে ইসরায়েল, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল সেই চু্ক্তি অনুযায়ী দেশটির আয়তন হওয়ার কথা ২০ হাজার ৭৭০ বর্গ কিলোমিটার৷ কিন্তু ইসরাইলের আয়তন এখন ২৭ হাজার ৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার৷

রাষ্ট্র ভাষা----
 ইসরাইলের রাষ্ট্রভাষা  দু’টি৷ আধুনিক হিব্রু ভাষা এবং আরবি৷ হিব্রু ভাষার কথা তো সবাই শুনেছেন, কিন্তু ‘আধুনিক হিব্রু’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে তা হয়ত অনেকেই বুঝতে পারবেন না৷ এই ভাষাটি গত ১৯ শতকের শেষভাগ পর্যন্তও বিকশিত হয়েছে৷ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক হিব্রুর শেকড় প্রাচীন হিব্রু হলেও এখন এ ভাষায় ইংরেজি, স্লাভিচ, আরবি এবং জার্মানসহ অনেকগুলো বিদেশি ভাষার প্রভাব রয়েছে l
ইসরাইলের ‘সবাই’ সেনাসদস্য
ইসরাইল একমাত্র দেশ যেখানে প্রাপ্ত বয়স্ক সব নাগরিকের জন্যই সেনা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক৷ সুতরাং দেশটিতে যতজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সেনাসদস্যও এক অর্থে ততজন৷ সেনাপ্রশিক্ষণও স্বল্পমেয়াদি হয় না৷ সব প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেকে ৩ বছরের এবং মেয়েকে অন্তত ২ বছরের প্রশিক্ষণ নিতে হয়৷

ইসরাইলিও ফিলিস্তিনের সমর্থক----
ইহুদিদের একটি ধর্মীয় সংগঠন জিওনিজম মতবাদ ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে৷ সংগঠনটির নাম, ‘নেতুরেই কার্টা’ বা ‘নগর রক্ষক’৷ ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই সংগঠনটি ‘ফিলিস্তিনের সমর্থক’ হিসেবে পরিচিত৷
আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট হননি নোবেল বিজয়ী জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিনিধন বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন৷ ইসরাইল তার কথা শুধু কৃতজ্ঞচিত্তে মনেই রাখেনি, তাকে সম্মানও জানাতে চেয়েছিল প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে৷ ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আইনস্টাইন৷

ইসরাইলের মানুষ সত্যি সত্যিই ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রচুর চিঠি লিখে৷ প্রতি বছর জেরুসালেমের ডাক বিভাগ এমন অন্তত হাজার খানেক চিঠি পায় যেখানে প্রাপকের জায়গায় লেখা থাকে ‘ঈশ্বর’l

ইতিহাস বলছে, ইসরাইলের রাজধানী জেরুসালেমে এ পর্যন্ত ২৩ বার ভয়াবহ আগুন লেগেছে আর বহিঃশক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছে ৫২ বার৷ জেরুসলেম দখল এবং পুনরুদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ৪৪ বার৷
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ নোট
ইসরাইলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে বিশেষ মুদ্রা৷ ‘ব্রেইল’-এর মতো বর্ণের সহায়তায় কাগুজে নোটগুলোতে লেখা থাকে বলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কেনাকাটা বা মুদ্রা বিনিময়ে কোনো অসুবিধা হয় না৷ সারা বিশ্বে ইসরাইল ছাড়া ক্যানাডা, মেক্সিকো, ভারত আর রাশিয়াতেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে৷

৮০ লক্ষের চেয়ে সামান্য বেশি জনসংখ্যার এই দেশে অবিশ্বাস্যভাবে ৪ হাজারেরও বেশি প্রযুক্তি কোম্পানি রয়েছে। সিসকো, পেপাল, মাইক্রোসফট, গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল কিংবা ইনটেল হচ্ছে এমনই কিছু হাতেগোনা কোম্পানির নাম, যারা ইসরায়েলে নিজেদের নতুন পণ্য উৎপাদন ও গবেষণার কাজ করে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই বিষফোঁড়া  যুদ্ধ-বিগ্রহকে পাশ কাটিয়ে নিজেদেরকে বিশ্বে প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটিয়েছে,  তারা  বিশ্বকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়েছে সেটাই মূল বিষয় l

ইসরায়েলকে নির্দ্বিধায় বলা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত রাষ্ট্র। ইসরায়েলের প্রসঙ্গ চলে আসলে যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতের কথা অবধারিতভাবেই চলে আসে। কিন্তু আজকে আমি চেষ্টা করবো একটু অন্যদিকে আলোকপাত করতে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অসাধারণভাবে এগিয়ে যাওয়া এই দেশটি কীভাবে এই সাফল্য অর্জন করলো, সেটাই  মূল বিষয়।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলে ৪ হাজারেরও বেশি টেক-কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রথম সারির সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর নাম। বিশ্বের সবচেয়ে প্রধান ৫০০টি টেক-জায়ান্টের ৮০টিরই গবেষণাকেন্দ্র এবং নব্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কেন্দ্র রয়েছে ইসরায়েলে! আদতে টেক-স্টার্টআপের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির ঠিক পরেই রয়েছে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আভিবের নাম, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি কেন্দ্র। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত টেক-কোম্পানিগুলোর শেয়ারের জন্য তৈরি ন্যাসড্যাক স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকায় ইসরায়েল রয়েছে ৩ নাম্বারে, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র আর চীনই রয়েছে ইসরায়েলের উপরে। জার্মানি, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্সের সম্মিলিত প্রযুক্তি কোম্পানির তালিকাও রয়েছে ইসরায়েলে l

 এই মুহূর্তে পরবর্তী মডেলের আইফোনের হার্ডওয়্যারের বেশিরভাগই তৈরি করা হচ্ছে ইসরায়েলে। চীন হয়তো উৎপাদনের দিক থেকে এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু নতুন প্রযুক্তি গবেষণা, আবিষ্কার আর তা বাস্তবে তৈরি করার দিক থেকে সবার উপরে রয়েছে ইসরায়েল। গুগলের নতুন প্রযুক্তিগুলোর অনেকগুলোই তৈরি করেছে এই ইসরায়েলিরা। ইনটেল, বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রসেসর তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান, মাইক্রোচিপ নিয়ে গবেষণার জন্যও ইসরায়েলের গবেষকদের মুখাপেক্ষী। ইসরায়েলের ইনটেল কারখানায় কাজ করে ১১ হাজারেরও বেশি কর্মী, যেটি দেশের অন্যতম বড় প্রযুক্তি কারখানা। বিল গেটসের মাইক্রোসফটকেও ধরা হয় একটি আধা-ইসরায়েলি কোম্পানি হিসেবে, অর্থাৎ আপনার কম্পিউটারে চালিত উইন্ডোজ সফটওয়্যারটি ডেভেলপ করতেও অবদান রয়েছে কোনো ইসরায়েলি প্রযুক্তিবিদের।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ইসরায়েলের আয়ের অন্যতম বড় একটি অংশই আসে এই প্রযুক্তি খাত থেকে। আইবিএম, পেপাল, সিসকো, আমাজন, ফেসবুকসহ বড় বড় কোম্পানিগুলোর ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সেক্টরে কাজ করার ফলে এবং প্রযুক্তি আমদানির ফলে যে অর্থ আয় হয়, তা ইসরায়েলের জিডিপির ১২.৫%!


নব্বইয়ের দশককে ধরা হয় ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ দশটি বছর, বিশেষ করে অর্থনীতির দিক থেকে। প্রতিবছর প্রায় ১০০% মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থব্যবস্থায় ধস নেমেছে, বাজেটের ঘাটতি আর ঋণের বোঝা তখন দেশের প্রতিটি কোণার মানুষের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। মোদ্দাকথা, ইসরায়েলিদেরকে খেয়ে-পরে চলার জন্য পুরোটাই নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশি সাহায্যের উপর।  ইসরায়েল চেষ্টা করছে এই বাজে অবস্থা থেকে উঠে আসার জন্য, ঠিক তখনই ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে হাজির হলো প্রায় ৮ লক্ষ ইহুদি। সংখ্যাটা বেশ কম মনে হলেও তৎকালীন সময়ে ইসরায়েলের নাজুক অবস্থাকে আরো শোচনীয় করে তুলতে এটুকুই যথেষ্ট ছিল। এখন ইসরায়েলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো একটিই- কীভাবে এতগুলো বেকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে? ইসরায়েলের হাতে একটাই উপায়, পুরো অর্থনীতি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো।

প্রথমদিকে ইসরায়েল সরকার চেষ্টা করলো উদ্যোক্তাদেরকে নতুন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য, কিন্তু যে দেশে টাকাই নেই সেখানে কীভাবে নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে? আর কে-ই বা ইসরায়েলের মতো হাঙ্গামাপূর্ণ দেশে তাদের মূল্যবান অর্থ বিনিয়োগ করবে? আর তখনই সরকার বুঝতে পারলো যে একমাত্র আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভব। আর সেখান থেকেই শুরু হলো ‘ইয়জমা প্রোগ্রাম’।

হিব্রু ভাষায় ইয়জমার অর্থ হচ্ছে উদ্যোগ। এই পরিকল্পনার অধীনে ইসরায়েল সরকার ১০০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ১০টি ফান্ড তৈরি করলো। বহিরাগত কোম্পানির প্রতি ১২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পিছনে ইসরায়েল সরকার ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার মাধ্যমে কোম্পানির ৪০% মালিকানা দখলে রাখবে। যদি এখান থেকে লাভ হয়, তাহলে বিদেশি প্রতিষ্ঠান সামান্য সুদসহ সরকারের টাকা পরিশোধ করে সম্পূর্ণ কোম্পানির মালিক হয়ে যেতে পারবে, অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের জন্য পুরোটাই লাভ। অন্যদিকে আপাতদৃষ্টিতে ইসরায়েল সরকারের কোনো লাভ নেই মনে হলেও নতুন কোম্পানি আর কর্মসংস্থানের ফলে অর্জিত ট্যাক্স থেকেই সরকারের বিনিয়োগের খরচ উঠে যাবে।

আর এই পরিকল্পনার বাস্তব ফলাফল এর চেয়ে ভালো হওয়াও সম্ভব ছিল না। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো ইসরায়েলে বিনিয়োগ করা শুরু করলো, যেকোনো আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্যই টাকার বরাদ্দ রয়েছে। প্রথম আট বছরের মধ্যেই ফান্ডের সংখ্যা দাঁড়ালো ২০ থেকে ৫১৩ তে! আর ফলাফল? ইসরায়েলকে এখন ধরা হয় উদ্যোক্তাদের রাজধানী হিসেবে, এবং পরিসংখ্যানুযায়ী, প্রতিটি কোম্পানির প্রতিটি কর্মীর পিছনে প্রতি বছর ১৫০ মার্কিন ডলার করে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। তুলনা করা হলে, এটি স্পেনের একজন উদ্যোক্তার পেছনে বিনিয়োগের তুলনায় ৪০ গুণ বেশি! আর শুধু টাকাই নয়, টাকার সাথে সাথে যোগ হচ্ছে অভিজ্ঞতার পাহাড়ও।


অভিবাসন নীতি   ---
কোনো দেশের জনসংখ্যা অভিবাসীদের উপর নির্ভরশীল, প্রশ্নটির উত্তর নিঃসন্দেহে হবে ইসরায়েল। আদতে প্রতি ৩ জন ইসরায়েলির একজন বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছে! এবং প্রতি ১০ জনের ৯ জনই অভিবাসী এবং অভিবাসীদের সন্তান-সন্ততি। আর এটিই প্রমাণ করে কীভাবে স্বাধীনতার সত্তর বছরের মধ্যে একটি দেশের জনসংখ্যা ১০ গুণ বেড়ে গেল। ইসরায়েলের সংবিধান অনুযায়ী,

প্রত্যেক ইহুদির ইসরায়েলে বাস করার অধিকার  আছে
আর এই নীতিকে কোনো ছোটখাট জিনিস মনে করলে ভুল করে থাকবেন। জরিপ অনুযায়ী, যে দেশে অভিবাসীর সংখ্যা যত বেশি, সে দেশ ঠিক ততটাই ধনী। কারণ, অভিবাসীদের মধ্যে উদ্যোগ নেওয়ার প্রবণতা বেশি। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা এই ইহুদিদের সম্মেলন নতুন নতুন আইডিয়া বের করতে বড় ভূমিকা পালন করেছেI

শিক্ষাব্যবস্থা--
ইসরায়েলের এই বিরাট সাফল্যের মূল কারণ হচ্ছে এর শিক্ষাব্যবস্থা। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা হওয়ার ৩০ বছর আগেই ইহুদিরা জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠা করে ‘দ্য হিব্রু ইউনিভার্সিটি অফ জেরুজালেম’। বর্তমানে কলেজ ডিগ্রি অর্জনের দিক থেকে ইসরায়েল রয়েছে একেবারে প্রথমসারিতে। আর অন্য দেশ থেকে তাই  ইসরায়েলকে  আলাদা করা হয়েছে l

ইসরায়েলের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে একেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের যোগানদাতা হিসেবে আবার রয়েছে বিভিন্ন বৈদেশিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ফলে একজন শিক্ষার্থী যে শুধুই শিক্ষা গ্রহণ করে তা-ই নয়, বরং একইসাথে পেশাদার গবেষক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। এর ফলে ছাত্রাবস্থাতেই বের হয়ে আসে একেকজন উদ্যোক্তা, যার মাথায় ঘুরতে থাকে অসাধারণ সব আইডিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এসব গবেষণা আর উদ্ভাবনের মাধ্যমেই ইসরায়েল নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিধর দেশ হিসেবে।

আশির দশকের বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে ইসরায়েল তাদের জনসংখ্যা দুই গুণ বাড়িয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে চার গুণ, জিডিপির দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে স্পেন কিংবা ইতালির মতো উন্নত দেশকে। সর্বোপরি, প্রযুক্তি বিশ্বকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে তারা। বর্তমান যুগ হচ্ছে প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশের উন্নতি একপ্রকার অসম্ভব। ইসরায়েলকে মডেল হিসেবে ধরে অন্যান্য দেশও  প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে  অগ্রসর হলেই  মঙ্গল বলে আমার মনে হয়।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.