![]() |
| বাবুঘাটের অজানা কাহিনি : পিনাকী চৌধুরী |
দেখতে দেখতে বাবুঘাটের বয়স হল প্রায় ১৮৯ বছর ! স্রোতস্বিনী গঙ্গা নদী এখানে নিরন্তর বয়ে চলেছে ! মেঘ বৃষ্টির লুকোচুরির মতো কখনও কখনও সেখানে জোয়ার ভাটা খেলা করে । বস্তুতঃ দুর্গা পুজার পরে বিজয়া দশমীতে বাবুঘাটে প্রতিমা নিরঞ্জনের দৃশ্যটি অ-সা-ধা-র-ণ ! সারা রাত সেখানে প্রতিমা নিরঞ্জন দেখতে প্রচুর জনসমাগম ঘটে ! নৃত্যরত পুরুষ ও মহিলারা বিজয়া দশমীতে সুশৃঙ্খল ভাবে দেবী দুর্গাকে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেন ! আর গঙ্গা ঠিক পাড়েই অপেক্ষা করে থাকেন কতিপয় কুলি ! তাঁরই দেবীকে গঙ্গায় বিসর্জন দেন ! যথেষ্ট দৃষ্টিনন্দন সেই দৃশ্য ! কিন্তু কবে নির্মিত হয়েছিল এই বাবুঘাট ? সে বহুদিন আগেকার কথা , ১৮৩০ সালে জানবাজারের বাবু রাজচন্দ্র দাস এই প্রসিদ্ধ ঘাট নির্মাণ করেন । সম্পর্কে তিনি ছিলেন রাণী রাসমণির স্বামী । তদানীন্তন সময়ে সেই বাবু রাজচন্দ্র দাসের প্রভাব প্রতিপত্তিও যথেষ্ট ছিল ! সেইসময় তিনি চৌরঙ্গী থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত একটি পাকা রাস্তাও নির্মাণ করিয়েছিলেন ! তবে আজ হয়তো সেই চিরাচরিত বাবুয়ানা নেই, কিন্তু রয়ে গেছে প্রসিদ্ধ সেই বাবুঘাট ! তবে আজও এখানে জনসমাগম ঘটে আরও একটি অন্য কারণে , হ্যাঁ, বাবুঘাটের সেই চিরাচরিত ' মালিশ' এর কারণে ! চমকে উঠলেন ? সম্প্রতি এই প্রতিবেদক হাজির হয়েছিল বাবুঘাটে ! সেখানে গিয়ে দেখলাম পর পর প্রমাণ সাইজের কতকগুলো কাঠের পাটাতন রাখা , আর তার ওপরেই চলছে তৈলমর্দনের কাজ ! মনে মনে ভাবলাম, এ যেন ঠিক ম্যাসেজ পার্লার ! একজনের কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলাম " একটু কথা বলা যাবে "? উত্তরে তিনি জানালেন " হ্যাঁ"! বললাম " আপনাদের রেট কতো ?" বিড়ি খেতে খেতে তিনি জানান " আধ ঘন্টার জন্য ১৫০ টাকা, আর পুরো এক ঘন্টা মালিশের রেট পাক্কা ৩০০ টাকা"! লক্ষ্য করলাম যে, ম্যাসেজ শিল্পীরা কিভাবে অদ্ভুত ফিঙ্গারিং এর মতো করে সুনিপুণ হাতে ম্যাসেজ করে চলেছেন ! মনে মনে ভাবলাম, আরে এ যেন ফেলো কড়ি মাখো তেল ! ম্যাসেজ শিল্পীকে প্রশ্ন করলাম " আপনার নাম কি ? আর কবে থেকে এই পেশার সঙ্গে জড়িত ?" প্রশ্ন শুনে দু'দন্ড থামলেন তিনি ! তারপর বললেন " আমার নাম ধনেশ্বর বারিক ! আর আমরা সবাই ওড়িষ্যার লোক ! আচ্ছা, আপনি কি মালিশ করাবেন ?" ধনেশ্বরের প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে আমি বললাম " কতোদিন ধরে আপনারা এই কাজ করছেন ধনেশ্বর বাবু ?" উত্তর দিলেন " তা মনে করতে পারিনা, তবে আমরা সবাই বংশপরম্পরায় এই কাজ করছি বটে !" তেলের সাথে লেবু আর কর্পূরের অনবদ্য মিশ্রণ, যাকিনা আমাদের দেহ মনকে উজ্জীবিত করে এই মালিশের দ্বারা ! আর সত্যিই আমাদের মানবদেহের রক্ত চলাচলকে স্বাভাবিক রাখতে এবং বাতের ব্যাথা দূর করতে সত্যিই যেন এই মালিশের জুড়ি মেলা ভার ! ধনেশ্বরকে আবার প্রশ্ন করলাম " বাজার কেমন ?" হালকা হেসে তিনি বলেন " তেমন একটা নয় ! তবে শনিবার আর রবিবার এখানে প্রচুর ভিড় হয় ! জানেন দাদা , শুধুমাত্র কলকাতার লোকজনই নয় , বিদেশ থেকেও আগে অনেক ফরেনার এখানে এসে এই মালিশ নিয়েছেন !" তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে ! শেষ সূর্যরশ্মির ম্লান আলোটুকু যেন গঙ্গার জলে জাফরি কাটছে ! এবার আমার ঘরে ফেরার পালা ! ফিরতে ফিরতে ভাবলাম, বিচিত্র এক কর্মযজ্ঞ !

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন