উৎপলকুমার বসু ও নিজস্ব ভাবনা : মাধবী দাস

মাধবী দাস
উৎপলকুমার বসু ও নিজস্ব ভাবনা


বাংলা কবিতার জন্ম খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর পরবর্তীকালে ।তা ছিল রাজা মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ধন্য। ধর্ম-নীতি -নিয়মের বেড়াজালে তখন ,কবিদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল আবদ্ধ। কোনও এক বসন্তে প্রেমাস্পদের জন্য হৃদয় ব্যাকুল হলেও সেই স্বর্গীয় অনুভব কবিকে প্রকাশ করতে হতো রাধা কৃষ্ণের জবানীতে। 'কানু ছাড়া গীত নাই'। সপ্তদশ শতকে আরাকান রাজসভার মুসলমান কবিদের রচনায় মানব মানবীর প্রেম ব্যক্ত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু মনের কথা সাহিত্যিক রূপ পেল উনিশ শতকের রেনেসাঁসঞ্জাত ইউরোপীয় শিল্প-সাহিত্যের অনুপ্রেরণায় ।আর তাই যুগের ভাষা কাব্যের ভাষা হয়ে উঠল মধুসূদন রঙ্গলাল হেমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্রের হাতে।

ক্লাসিক কাব্যের সংহত ঘনপিনগ্ধ ভাব থেকে কাব্য কে মুক্তি দেওয়ার জন্য ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকে রোমান্টিক কাব্যের যাত্রা শুরু হলেও এর সূত্রপাত আসলে জার্মানে।উনিশ শতকের বাংলা কবিতায় রয়েছে সেই সাহিত্যেরও গভীর প্রভাব ।এই ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলি হল -সুদূরের পিপাসা ,রাজনৈতিক ভাবনা চিন্তা ,মানবিক চেতনা, যান্ত্রিকতার বিরোধিতা, ও স্বদেশ ভাবনা সেই সময়কার কবিদের রচনায় স্বদেশ প্রেম ও সমসাময়িক চিন্তা ভাবনা কাব্যরূপ পেলেও অনেকেই নিভৃত বিশুদ্ধ কাব্য লক্ষ্মীর আরাধনাও করেছেন। মধুসূদন দত্ত -এর 'আত্মবিলাপ' কিংবা 'বঙ্গভূমির প্রতি' কবিতায় গীতি কবিতার আভাস পাওয়া যায় ।ঠিক এই ধারায় সার্বিকভাবে প্রথম কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে তা পূর্ণরূপে বিকশিত হয় ।চিরন্তন অনুভূতি দিয়ে চির সুন্দরের বর্ণনা করেছেন তিনি ।রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন সাময়িক প্রয়োজনে যা লেখা হয় প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সেই সাহিত্যের পাঠক ফুরিয়ে যায় ।যে সাহিত্যের পাঠক নেই তা মৃত সাহিত্য ।এভাবে রবীন্দ্র যুগে রবীন্দ্র অনুসারী, রবীন্দ্রবিরোধী ও রবীন্দ্রোত্তর কবি গোষ্ঠী কালের উত্তাল ঢেউয়ে কেউ নিতান্ত অবহেলায় আবার কেউ সমাদৃত হতে হতে ভেসে চলেছেন পাঠকের মনসমুদ্রে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত যে সকল কবি আমার নিজস্বতায় বিশেষভাবে উল্লেখ্য তাঁরা হলেন --সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ,কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস, সুকান্ত ভট্টাচার্য, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বিনয় মজুমদার, নবনীতা দেব সেন, মল্লিকা সেনগুপ্ত ,শঙ্খ ঘোষ ,জয় গোস্বামী প্রমুখ।

এমনই একজন কবি- ব্যক্তিত্ব ,পঞ্চাশ দশকের উজ্জ্বল নক্ষত্র উৎপলকুমার বসু ।বাংলা কবিতায় বিষয় ও আঙ্গিকের ব্যাপার নিয়ে যেসব কাব্য আন্দোলন গড়ে উঠেছে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের গোষ্ঠী সেগুলোর মধ্যে স্মরণীয় ।এই গোষ্ঠী কবিতার মাধ্যমে জীবনের অর্থ বের করবার গতানুগতিক প্রয়াসের ইতি টেনে কবিতাকে অনর্থ বের করবার কাজে ব্যবহার করতে চাইলেন ।তাই তাঁদের কবিতায় ফুটে ওঠে মানবিক, দৈহিক ,শারীরিক ক্ষুধার কথা ।এই ধারায় প্রথমদিকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরী ,সমীর রায় চৌধুরী, অরুণেশ ঘোষ ও অন্যান্য অনেকেই ছিলেন। কৃত্তিবাস- এর সঙ্গে থেকেও উৎপল কুমার বসু এঁদের আদর্শকে ভালবেসে যোগদান করেন ।যদিও পরবর্তীকালে মামলায় জড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের কথা ঘোষণা করেন উৎপল কুমার বসু।-'I feel that their literary movement degenerated into depravity and I have disassociated myself from hungry generation.'
উৎপলকুমার বসুর জন্ম ১৯৩৭ সালের ৩ আগস্ট কলকাতায় ।কিন্তু তাঁর ছেলেবেলার বেশি সময় কেটেছে কুচবিহারের দিনহাটায় ।মা অসুস্থ হওয়ায় মাসি তাঁকে দিনহাটায় নিয়ে আসেন ।কয়েক মাস পরেই কবির মা মারা যান ।তারপর দিনহাটায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় তাঁকে ।সময়টা ছিল বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ।তখনকার দিনহাটা আজকের মতো এত উন্নত ছিল না। বৈদ্যুতিক আলো পৌঁছয়নি তখনও। দিনহাটার রূপকার কমল গুহ মহাশয়কে তিনি শিক্ষক হিসেবে পান । তাঁর বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন দিনহাটার আর একজন বিখ্যাত ছেলে ,পেয়ারাদাকে। যাঁর ভালো নাম এরশাদ ।পরে এই সুযোগ্য ছেলে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া শোনার পর উৎপল কুমার বসু আবার কলকাতায় চলে যান। সেখানে তাঁর বাবা তাকে স্কটিশ চার্চ -এ ভর্তি করে দেন ।তারপর আশুতোষ কলেজ থেকে বিএসসি ও প্রেসিডেন্সি থেকে এমএসসি করেন। পড়বার সময় থেকেই লেখালেখিতে আত্মপ্রকাশ। সেই সময় পুজো সংখ্যার দেশ এ লেখা প্রকাশিত হয় তাঁর। ওঠা বসা ছিল আনন্দ বাগচী, দীপক মজুমদার ,দীপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এঁদের সঙ্গে ।ক্রমশ কৃত্তিবাস পত্রিকার ঘরের লোক হয়ে উঠলেন তিনি। যোগাযোগ হয় শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে ।বোনের বিয়ে হয় শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে ।বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যান প্যারিসে। সেখান থেকে লন্ডন। লন্ডনে এডুকেশন অথরিটি তাঁকে পড়াতে বলেন। সেখানে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্ট ও আরও বেশ কিছু সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন । তাঁর বন্ধুত্ব ছিল 'ব্যান্ডিট কুইন' -এর লেখিকা মালা সেনের সঙ্গে। লন্ডন আর প্যারিসে থাকার সময় ফিল্ম মুভমেন্টের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। প্রায় এক যুগ কাটিয়ে ফিরে আসেন কলকাতায় ।যোগদান করেন মেঘমল্লার-এ। শুরু হল পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে সাহিত্য আড্ডা ও সাহিত্য চর্চা। পরবর্তীকালে নব্বই দশকের শুরুতে এই উদ্দেশ্যেই তাঁর প্রস্তাব ও পরিকল্পনা শুরু হয় নির্ভেজাল বৌদ্ধিক আড্ডা 'কলোকিয়াম'।

'কৃত্তিবাস' -এর বিপ্লবী মানসিকতা আর হাংরিজেনারেশনের অতিবিপ্লবী ও পোস্টমডার্ন মানসিকতাকে সামনে রেখে নতুন করে জীবন শুরু হয় তাঁর ।কবি হিসেবে উৎপলকুমার বসুর প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা একই সময়ে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চৈত্রে রচিত কবিতা '(১৯৬১)র ভাষা প্রচলিত বাকরীতি এবং কাব্যিক মুদ্রা গুলিকে এক ধাক্কায় নস্যাৎ করে দিয়েছিল ।গতানুগতিক আখ্যানধর্মী চলনকে বদলে নিলেন অসমাপ্ত কথার মতো পরিমিত প্রতীক আর স্ংকতে। তাঁর কবিতায় ছিল রূপকথা আর যাদুবিদ্যার পরম্পরা ।' চৈত্রে রচিত কবিতা'য় বিশেষ্য ,বিশেষণ ও ক্রিয়াপদ গুলি নির্দিষ্ট ভূমিকা বদলে আধুনিকতার ভিন্ন এক সম্ভাবনা যোগ করেছে।বাংলা কাব্য সাহিত্যে। তাই তিনি ও তাঁর কবিতা তরুণ কবিদের কাছে হয়ে উঠেছিল অনুসরণ ও অনুশীলনের ক্ষেত্র।

তিনি মনে করতেন কবিতার বাস্তবতা যেন ভেঙে পড়ার জন্যই সৃষ্টি হয় ।আবার প্রতিফলনেই সে নিজেকে পুনর্গঠিত করে ।তাই দৈনন্দিন জীবনে চলা ফেরার পথে ক্ষেত-খামার অনাবৃষ্টি ,বেকারি ,বিপ্লব, হরীতকী কিংবা কার্পাস তুলোর গাছ ,ধর্মীয় কুসংস্কার কিংবা গাছপালা নদী পাখি কিংবা বিড়াল কুকুর ,নিরক্ষর বেশ্যা কিংবা হোটেল বয় রাজু ,সজল ও সজল এর বউ কোনও কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই তিনি লিখতে পারেন---
১) "এখানে তুলা ও রমণী একত্রে ওজনে ওঠে। এইখানে সর্প ও বৃশ্চিক একত্রে অপেক্ষা করে খদ্দের আসার। মরে গেলে হবে ?তারও পরে খরচাপাতি আছে।"
২)" জ্যোৎস্না এখানে নেই ।তাকে কাল হাই স্কুলের/ পোড়ো বারান্দার পাশে দেখা গেছে/ সে তার পুরনো আধুনিক শাড়িটি বিছিয়ে ওইখানে শুয়ে ছিল।"
৩) "মোহান্ত মেঘের দল যজ্ঞিডুমুর গাছ আড়ালে কিংশুক,/রৌদ্রে বেরিয়ে পড়েছে ভাম, সাঁঝপাখি ,বাদুড় ,নেউল /চায়ের দোকান ফাঁকা/ চুনভাঁটি জনহীন"-" জঙ্গল দেখার আগে বৃষ্টি দেখা ভালো "--এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে ।আসলে কবিতায় তার ভূমিকা একজন উদাসীন দূরত্বসঞ্চারী স্বগতোক্তিময় নিরপেক্ষ দর্শকের।

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় 'পুরী সিরিজ ' বইটি আকারে চটি হলেও প্রকাশে এ যুগের নিদর্শন। অসামান্য বাক্যবিন্যাস,স্মৃতি-বিস্মৃতি ও যৌথ অবচেতন সংকেতে কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে রহস্যময় এবং পুনর্নির্মাণ প্রত্যাশী। এক কথায় কবি ও পাঠকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী এক বিশেষ পদ্ধতি ।যেখানে পাঠককেই কবি দায়িত্ব দেন বহুস্তরিক উন্মোচনের ও পূনর্গঠনের।১৯৭৮ -এ দীর্ঘ প্রবাস থেকে ফিরেও মেধাবী কণ্ঠস্বরে নির্মাণ করলেন 'আবার পুরী সিরিজ'। এখানেও ফুটে ওঠে সেই জনপদেরই কথকতা। আর অতল অভিজ্ঞতায় ডুবে যাওয়ার ইঙ্গিত।

সব মিলে কুড়িটি কাব্যগ্রন্থ, প্রচুর গদ্যগ্রন্থ, গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ।কবিতার মতোই গদ্যের ভাষাও ছিল বহুকৌণিক, বহু স্তরীয় ও রহস্যময় ।তাঁর প্রায় সব লেখাই ঘুরে ফিরে কবিতা বা কবিতার জন্য ।তাই কবিতা রচনার নেপথ্য কাহিনীও কবিতা হয়ে উঠেছে ।চিরচেনা এক টুকরো জীবন কিংবা ঘটনাকে রহস্যে আবৃত করে সেই রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন পাঠকের উপর। এভাবেই তাঁর কবিতায় কবির পাশাপাশি পাঠকেরও এক সম্মানীয় স্থান প্রাপ্তি ঘটে ।সেতুবন্ধন ঘটে কবি ও পাঠকের মধ্যে ।আর তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা কবিতার কয়েক দশকের শাসক।'টুসু আমার চিন্তা মণি' ,'সলমাজরির কাজ' ,'হাঁস চলার পথ', 'বক্সীগঞ্জে পদ্মা পাড়ে' সুখ-দুঃখের সাথী(আনন্দ পুরস্কার,২০১৬)- এমন অনেক গ্রন্থের স্রষ্টা উৎপল কুমার বসু ২০১৫ এর ৩ আগস্ট ৭৬ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে
না-ফেরার দেশে চলে যান। আমরা তাঁকে স্মরণে রাখব চিরদিন। তাঁর সৃষ্টি সোনার তরীতে করে ভেসে বেড়াবে মহাকালের ঘাটে ঘাটে।


সূত্র:
প্রান্তিক দৃশ্যের পথে- পঙ্কজ চক্রবর্তী
কালীকৃষ্ণ গুহ -এর নক্ষত্রের সাজানো ডানা
শঙ্খ ঘোষ -এর গদ্য সংগ্রহ
হাংরি শ্রুতি ও শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলন- উত্তম দাস
সুখ দুঃখের সাথী -উৎপল কুমার বসু ।
স্বপ্নের ভেতর দিয়ে উৎপল দা -কবি নাসের হোসেন।
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.