শুধুমাত্র নতুন বাংলা বছরেই নয়, বস্তুতঃ সারা বছরই বাংলা পঞ্জিকার চাহিদা তুঙ্গে থাকে। সত্যি, এ যেন এক সব পেয়েছির দেশ! ব্যক্তিগত রাশিফল, লগ্নফল থেকে শুরু করে পূর্ণিমা, অমাবস্যা সময় নির্ধারণ, এছাড়াও দুর্গাপুজো ও দীপান্বিতা কালীপুজোর বিস্তারিত বিবরণ বর্ণিত থাকে এইসব পঞ্জিকায়। এছাড়াও গঙ্গায় জোয়ার ভাটার সময় এবং মৃতদেহ সৎকারের বিবরণ দেওয়া হয় পঞ্জিকায়। বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি সম্বলিত এইসব পঞ্জিকা আজও তুলনারহিত। আর এই হিন্দু পঞ্জিকা হল হিন্দু ধর্মে প্রথাগত ভাবে ব্যবহৃত চান্দ্র নক্ষত্র পঞ্জিকা সমূহের এক সমষ্টিগত বিশেষ নাম।
এখানে বলে রাখা ভাল যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিন্দু পঞ্জিকা পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের সেই সাদা কালো দিনের, মানে গুপ্ত যুগের বরাহমিহির এবং আর্যভট্টের বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ্যার ফসল। কিন্তু কবে চালু হয়েছিল প্রথম পঞ্জিকা ? সম্ভবত বৈদিক যুগ থেকেই এই হিন্দু পঞ্জিকার প্রচলন হয়েছিল, তবে এই হিন্দু পঞ্জিকা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায় সূর্য সিদ্ধান্ত নামের সেই বিখ্যাত গ্রন্থটি থেকে। এখানে উল্লেখ্য, সুপ্রাচীন বৈদিক পঞ্জিকায় কিন্তু বছরের শুরুটা হত অগ্রহায়ণ মাসে ( অগ্র = প্রথম+ অয়ন = সূর্যের গতি) । আর এই অগ্রহায়ণ মাসে সূর্য বিষুবরেখাকে অতিক্রম করে। তবে পরবর্তী সময়ে কিছু হিন্দু পঞ্জিকা বৈশাখ মাসকে বর্ষারম্ভ মেনে নিতে বাধ্য হয়।
১৯৫৭ সালে সেই হিন্দু পঞ্জিকার ওপর ভিত্তি করেই ভারতের জাতীয় বর্ষপঞ্জি শক সংবৎ গঠিত হয়। আর যেন রচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। বর্তমানে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকাটি জনপ্রিয়, এছাড়াও গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকারও বেশ সুনাম রয়েছে। বস্তুতঃ পঞ্জিকা ছাড়া যেন বাঙালির যাপিত জীবন অসম্পূর্ণ। আর প্রত্যেক পুরোহিত এইসব পঞ্জিকা অনুসরণ করেন। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকাটি ১২৯৭ বঙ্গাব্দে ( ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে) গণিতজ্ঞ মাধবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত ও সম্পাদিত, সেই থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে পঞ্জিকাটি। আর রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের প্রতিটি শাখাই কিন্তু এই বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকাকে অনুসরণ করে বিভিন্ন ধর্মীয় রীতিনীতি ও উৎসব সম্পন্ন করে।
ভারতবর্ষ তখন সদ্য স্বাধীন এক দেশ, ১৯৫২ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে গঠিত ' পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি' ভারতীয় পঞ্জিকা গুলিতে সংস্কার সাধন করে একটি রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ প্রণয়ন করে। আশ্চর্যের বিষয় হল, সেই পঞ্জিকার বিজ্ঞান ভিত্তিক গণণার সঙ্গে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার গণণা হুবহু এক! নির্ভূল ভাবে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র, তিথির অবস্থান নির্ণয় করা হয় এইসব পঞ্জিকায়। সময় থেমে থাকেনি, তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজও হয়তো এইসব পঞ্জিকার চাহিদা রয়েছে, কিন্তু কিছুটা হলেও জৌলুস হারিয়েছে পঞ্জিকা।
বর্তমানে এইসব পঞ্জিকায় বিভিন্ন জ্যোতিষীদের বিজ্ঞাপন নজর কাড়ে। এছাড়াও থাকে শ্বেতী বা দাগ দূর করবার বিজ্ঞাপন। তবে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের গ্লোব নার্সারির বড় মূলো আর গাজরের সেই বিখ্যাত ও বহূলচর্চিত বিজ্ঞাপন আজ যেন কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ! তবে আজও বাঙালির একান্ত আপন এবং অবশ্যই পরম আদররেও বটে এইসব পঞ্জিকা ! আজও বাঙালি নিরিবিলিতে এইসব পঞ্জিকায় চোখ বুলিয়ে যেন শান্তি পায় ! আভিজাত্যে এবং অবশ্যই গরিমায় এইসব পঞ্জিকা আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিদায়'২৬ - স্বাগত'২৭ !
বিজ্ঞাপন : আমাদের কাছে লেখা পাঠান ৯২৩২২৩৭৮৭১ এই নাম্বারে।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন