সুবীর সরকারের লোকসংগীত শুনি, সরাসরি আলোচনা : বাবলি সূত্রধর সাহা

সুবীর সরকার
সুবীর সরকারের লোকসংগীত শুনি, সরাসরি আলোচনা : বাবলি সূত্রধর সাহা

      The Royal city  মানে রাজার শহর কোচবিহারের কবি সুবীর সরকারের সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ " লোক সংগীত শুনি "- পড়তে পড়তে ঢুকে যাচ্ছিলাম তথাকথিত তাঁবুর ভেতরে। গানবাড়ি, উত্তর জনপদের মাটি, জল, গ্রামীন ভূমিসংলগ্ন জনমানুষকে জড়িয়ে থাকা কবির এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার লাইন," অন্ধকারে পাশ ফিরতে থাকা নদী কি শুনবে ব্যক্তিগত হাহাকারের কথা।" একদমই তাই, মানুষই শোনে না, নদী কেন শুনবে? অথচ কবি ঠিক শোনে। বিশেষতই তিনি যদি হন মাটি ছুঁয়ে থাকা কবি।" ইশারার ইশারায় কথা বলি। ফন্দি থেকে সরে যাচ্ছে ফিকির। হাহাকারের কবিতা পৃঃ-৭  কি দুর্দান্ত সাংকেতিক শব্দের ম্যাজিক ইশারাতে বন্দি। যান্ত্রিক রোবট যুগে ফন্দি ফিকির খুঁজেই জীবন এগিয়ে চলে আবার অসাবধানতায় ফন্দি থেকে সরেও যায় ফিকির।  

মাহুত বন্ধুর কবি সুবীর সরকার দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরের তরুন প্রজন্মের কবিদের অতল জলের থেকে সেঁচে তুলছেন। যেখানে যত তরুন কবিরা লিখছেন, তাদের জনসমক্ষে তুলে ধরার কাজটিতে তিনি সত্যিই দায়বদ্ধ। আজকাল পত্রিকায় আগামী প্রজন্মের পরিচিতি নিষ্ঠার সাথেই দিয়ে চলেছেন। কবি যে অন্যের জন্য বাঁচেন এবং ভাবেন এটা তারই প্রমান। এই ভাবনা থেকেই তিনি হেঁটে যান কবিতার মিছিলে।" এসো দিক দিগন্তের কথা বলি।করাত কলের সামনে থেকে শুরু করি পদযাত্রা।(  ডায়েরি) পৃঃ৮৷

গ্রাম বাংলার হাটে, মাঠে, টাঁড়ে তাঁর অবাধ বিচরন। এই চলার পথেই উঠে আসে কিন্দুস এক্কা, ডানকান সাহেব আর হেরম্ব চরিত। জঙ্গল থেকে বাঘ বেরিয়ে ঘাসবনেও নামছে খাদ্যের খোঁজে,আর লুকিয়ে থাকা বেড়ালেরাও থাবা গুটিয়ে নেয়। পারিপার্শ্বিক হিংস্র বাঘের ছায়া সরিয়েও কবি এক মায়ার ভেতরেই থাকেন।" বাঘ যখন ঘাসবনে নেমে পড়ে তখন থাবা গুটিয়ে নিতে থাকে বেড়ালেরা"। চোখ মানে তো আস্ত এক সাদা কাগজ। ( বাঘ  পৃঃ৯)  অক্ষরহীন সাদা কাগজে ফুটে ওঠে এক জোড়া চোখ। 
 


অসম্ভব আত্মগোপন করে কবি তাঁর কবিতাকে গেরিলাযুদ্ধের তরবারি করেছেন। চরম বিপন্নতার মাঝেও তিনি প্রেমকে স্থান দিয়েছেন ইথার তরঙ্গে।" কবিতা এক ধরনের গেরিলা যুদ্ধ।ইথার তরঙ্গে ভেসে আসছে মশা মাছিদের গান" ( প্রেম ১ পৃঃ১০) তুমুল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সব মানুষ। অসম্ভব রদবদল আর তীব্র জেনেটিক্যালি পাল্টে যাচ্ছে মানুষ আর সম্পর্ক।" আমাদের সম্পর্কের মধ্যে দূরপাল্লার গাড়ি এসে ঢোকে। (প্রেম ২ পৃঃ১১)।  মুহূর্তে রং পাল্টে যাওয়া গিরগিটি রুপি মানুষকেও রুমালের আাস্তরনে ঢেকে ফেলতে চেয়েছেন।" রুমাল দিয়ে ঢেকে দিচ্ছি আমি গিরগিটির লেজ" ( প্রেম ২ পৃঃ১১)। 

কবি সুবীর সরকারের  প্রতিটি কবিতা যেন আশ্চর্য ম্যাজিক।প্রচন্ড শীতে যেমন উষ্ণতার প্রয়োজন হয় তেমনই জীবনকে খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে পাওয়াই হোক বা ছকহীন যাপনেই হোক তাঁর কবিতাকে বুঝতে গেলে একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন হয়। একটা কুয়াশা- জল,মায়াবী- আলো, আর বরফ- শীত সামঞ্জস্য থাকে কবিতার পরতে পরতে। সব কবিতাই মনে হয় জীবন বোধের কথা। তেমনই ছুঁয়ে থাকে পিকনিক আর ডুবন্ত জাহাজ।" শহরে ওল্টানো নৌকায় তুমুল কোলাহল,মিশে যায় বরফকলের পাশে।"( জাহাজ ডুবি পৃঃ১৩)। ঈশ্বরের আশীর্বাদ কবির ওপরে নাকি বেশি থাকে। তাই তিনি সকলের চেয়ে আলাদা আর মান অপমানের উর্ধে।তবুও জীবনে কোন না কোন সময় কবিকেও অপমানিত হতে হয়।  তাই তিনি লিখতে পারেন," অপমানিত হবার পর জাস্ট এক গ্লাস জল খাই আমি।এবং তারপর প্রাপ্তি শুধুই কুড়িয়ে পাওয়া পালকের" ( আরোগ্য পৃঃ১৩)।  
 
বাবলি সূত্রধর সাহা
প্রেম তাঁর জীবনে গাছের পাতা ছুঁয়ে রোদ সরে যাওয়ার মতো। জীবন যে যাওয়া আসার কার্নিভাল। এই প্রত্যাবর্তনের স্ন্যাপেই ঝলসে ওঠে প্রেমিকার আঙুল ছোঁয়া টি- শার্ট আর সজারুর কাটার মতো মুহুর্ত।" আমার টি- শার্টে তোমার আঙুল/ সামান্য জীবনে সজারুর কাটা।" ( প্রেম -৩ পৃঃ ১৫)। চলতে চলতে কবির অনুভবের দৃশ্যে ছায়া ফেলে নিঃসঙ্গতা। অপ্রীতিকর ঘটনা, আঁধার মাখা সামাজিক ঘটনা সমূহ আততায়ীর মতে তাড়া করে প্রতি মুহূর্তে। তিনি লেখেন মর্মান্তিক শব্দগুচ্ছ - ঘাসবনে লুকিয়ে থাকছেন আততায়ী,একটি হরিণ তাকে তাড়া করছে।"( ঘাসবন পৃঃ১৪)।    অদ্ভুত মায়া আার বিষাদ দিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন কুষ্টিয়া,শিলাইদহ, আর হাসন রাজার দেশে। ছিন্ন পত্রের শিরা উপশিরায় জ্যোতিদাদা, আব্দুলমাঝি আর  চাঁদনি রাতে শমীর চলে যাওয়ার দারুন প্রতিফলন এই কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে।" শমী যেদিন চলে গেল সে রাতে কি সুন্দর চাঁদের আলো" আর হাসন রাজার দেশে খুব রবীন্দ্রগান বাজে" ( রবীন্দ্রনাথ সমীপেষু পৃঃ ১৬)।  


সকলকে বলব কবির এই আশ্চর্য কবিতার মিছিলে শরীক হতে। বিশেষত এই কবিতাটিতে নস্টালজিয়ার যে ম্যাজিক তিনি দেখিয়েছেন তা না পড়লে বোঝা যাবে না। কবি সুবীর সরকার বাংলা কবিতার ডিকসনারিতে এক ম্যাজিক ম্যান। তুমুল আলোড়ন আর ভাঙাগড়া করেছেন বাংলা শব্দে। তিনি পেশাগত ভাবে স্কুল শিক্ষকের দায়িত্ব সামলে নিয়েও প্রতিনিয়ত নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন কবিত আর কবিদের যাপনে। মাটির টান আর মাহুত বন্ধুর মায়া জড়ানো গান হৃদয়ের জারকে বাঁচিয়ে রেখেও তিনি কুড়িটি কাব্যগ্রন্থের লেখক।আর গদ্যের ঝুলিটিও, ১১ টি স্বর্ণকনায় পরিপূর্ণ।

মুখে না বলেও যে তিনি স্বহস্তে অক্ষর চাষ করতে পারেন এটা স্পষ্ট। মোম মাখা আঙুল আর হাঁসমিছিলের স্বপ্নে তিনি বিভোর -" বলেছিলে হাঁসমিছিল দেখাবে "( প্রেম -৪) পৃঃ১৭। এক জোড়া চোখের তাপে পুড়ে নিজেই খাঁটি সোনা হয়ে উঠতে চাইছেন। মোট ১৮ টি কবিতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থটি। সবকটি কবিতাই এক একটা মিথ্। আঞ্চলিক  সীমানা পেড়িয়ে উত্তরের  এই নব্বই দশকের কবি তুমুল জনপ্রিয়। সুদূর বাংলাদেশেও তাঁর সমান জনপ্রিয়তা। দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গী কবিতা, একঝাঁক তরুন আর ক্যামেরা। তাই হয়তো লেখাই যায় " কাকডাকা ভোর। কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ক্যামেরা। তাঁবুতে গরম কফি। করিডোর দিয়ে হেঁটে পৌঁছে যাই আইসবারে".। (আইসবার পৃঃ২০)। নিজস্ব সত্ত্বাকে অনুসরন করেই তিনি দুর্দান্ত এ্যাডভেঞ্চারের পথে হাঁটছেন। কাল্পনিক তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েই তিনি আহত বাঘেদের খুঁজে চলেন। তাঁবুতে মোমের আলো, তাঁবুতে শিকার ঢুকছে" ( শিকার   পৃঃ২১)। 

কবি নির্জনতা,নিস্তব্ধতা প্রিয় মানুষ। স্তব্ধতা কিভাবে নিস্তব্ধতার দিকে আকর্ষিত হয় তা বোঝা যায় শোকযাত্রার প্রতিবেদন কবিতাটিতে। বইয়ে সবচেয়ে বড় কবিতা এটিই। জীবন মানেই দীর্ঘ ভ্রমন আর দৃশ্যান্তর। একটা বিবর্ণ শীত বিকেল,গোপন রিং টোন এবং ডার্কনেস চকলেটের সংমিশ্রন শব্দের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।সুনামির সতর্কতা শুনেও পোড়োবাড়ির দিকে পদযাত্রা শুরু করলেন ম্যাজিসিয়ান।"( শোকযাত্রার প্রতিবেদন পৃঃ ২২)। সব ভ্রমন শেষে ঘুরে ফিরেই কবি  ফিরে আসেন গঞ্জের ভাঙা হাটে কুপির আলোর পাশে মোরগ লড়াই এবং দূরাগত বাতাস এসে বিষাদেই পর্যবসিত হয়। " অথচ ভাঙা হাট। কুপির আলোর পাশে মোরগ লড়াই।"( ঘোড়া পৃঃ২৩)। 

আশ্চর্য শব্দের বুনোটে কবি জীবন আর লোকসংগীতকে একে অন্যের পরিপূরক করে তুলেছেন। কারন দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গোয়ালপাড়িয়া লোকসংগীতের ভাবধারায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন। কার্যত খাঁচার ভিতর অচিন পাখির মতো মৃত্যুকেও রোধ করা যায়না।" চারপাশে মৃতদের হাড়,এসো লোকসংগীত শুনি।"( লোক সংগীত শুনি)  শেষ কবিতা। স্বজন বন্ধুদের বিচ্ছেদ আর চরম মৃত্যুঘোর কবিকে যন্ত্রনা দেয়। তবুও বিষন্নতা, বিপন্নতার মাঝেও কবি এক ব্রাহ্ম মুহূর্তের অপেক্ষায় সদা নিমগ্ন থাকেন যোগী পুরুষের মতো। কবিতাই যেন তাঁর পরম আশ্রয় হয়। আমরা তাঁর অনুরাগী পাঠকেরা যেন এই নীল গ্রহতেই পুনর্জন্ম লাভ করি কবিতা আস্বাদনের জন্য। বাংলা কবিতার দক্ষ ম্যাজিসিয়ান আপনাকে স্যালুট .... ।।

লোকসংগীত শুনি
সুবীর সরকার
আলো পৃথিবী প্রকাশন।
মূল্য -৪০.০০
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.