![]() |
| আমি সহসা আমারে চিনেছি : মৃদুল শ্রীমানী |
একটানা তাড়া তাড়া কাগজ সই করে চলেছি। ফুড কুপন। এগুলো হাতে নিয়ে সেইসব মানুষ বলে বিনি পয়সায় রেশন তুলবেন, যাঁদের রেশনকার্ড হাতে পৌঁছয় নি। একটু আগে গরিব, লক ডাউনে ঘরের বাইরে আটকে থাকা মজদুরের হাতে ফুড প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে এসেছি। তার আগে রেশন দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকের কাছে বলেছি, ছয় মাস চাল আর আটা বিনি পয়সায়। আর সেই সব ছবি ফেসবুকে দিয়েছি। আমি কাজের ছলে নিজের সঙ্গে ছলনা করি।
তারপর অফিসে ফিরে তাড়া তাড়া কাগজ সই করতে করতে চৈত্রের পড়ন্ত বেলায় চোখে নেমে আসছে তন্দ্রা। চোখের আর দোষ কি। রাতের বেলা মনে হয় বাড়ির লোকজন ঠিক খেতে পাচ্ছে তো? সাতশো কিলোমিটার দূরে পড়ে থাকা মানুষটা একলা হলে বাড়ি তাকে ডাক দেয় আয় আয়। ঝিমুনির মধ্যে দেখছি কদিনের জন্যে লকডাউন আলগা করতে দুরন্ত ভীড় ট্রেনে রাত জেগে বাড়িতে চলেছি। সারাটা পথ কোনো মতে বসে কেটেছে। কিন্তু পাড়ায় ঢুকতেই হল বিপত্তি। যত সারমেয় পাড়ায় ছিল আমার উসকো খুসকো চেহারা দেখে খেউ খেউ শুরু করল। তারপর লোকজন বেরিয়ে যেই আমায় দেখতে পেল, বললো পাড়ায় ঢুকতে দেব না। আমি হাতজোড় করে বললাম, ঠিক দুদিনের জন্য ছুটি পেয়েছি। দুটো দিন থেকে ই আবার চলে যাব। আমায় বাড়ি ঢুকতে দিন। খরখরে গলায় কে বলল, আরে দুদিন তো অনেক বেশি, দু মিনিট এই পাড়ায় থাকতে দেব না। করোনা তাড়াবই।
আমি তাকিয়ে দেখলাম ছয়মাস আগে এই লোকটা কে গেজেটেড অফিসার হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়েছিলাম, আমি তাকে কুড়ি বছর চিনি। আজ ছয়মাস পেরোতে সেই আমি তাকে হাতজোড় করে বললাম, সারারাত ট্রেনে খুব কষ্ট করে এসেছি। আমি এখন কোথায় যাব বলুন?আরেক জন বলল, শ্লা ফেসবুকে পোস্ট দেবার সময় নিজেকে খুব মহান ভাবছিলি না? করোনা সংকটে যুদ্ধ করছি। আগে দূর হ। বেরিয়ে যা বলছি! তাকিয়ে দেখলাম, একে একদিন আমি ক্যারেকটার সার্টিফিকেট দিয়ে লিখে ছিলাম আই উইশ হিজ এভরি সাকসেস ইন দিস স্ফিয়ার।
আমার চোখে জল বেরিয়ে আসতে শুরু করছে। আমি তো এ পাড়ায় আজন্ম কাল রয়েছি। আজ আমায় থাকতে দিন। হঠাৎ পিঠে একটা ঢিল। তারপর মাথায়। আমার মাথা দিয়ে গরম জল বেরোচ্ছে কেন? আমি হঠাৎ দৌড়তে শুরু করলাম। সব লোক আমার পিছনে পিছনে দৌড়চ্ছে। মার্ মার্, একেবারে শেষ করে দে। হঠাৎ চটকা ভেঙে মনে পড়ল করোনা আতঙ্কে ডাক্তার নার্সদের বাড়িওলারা ঢুকতে দিচ্ছে না।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন