প্রতিদান : মিঠুন রায়

প্রতিদান : মিঠুন রায়
প্রতিদান : মিঠুন রায়

প্রিয়ার বয়স সবেমাত্র সাতাশ। গতবছর অর্থনীতি নিয়েই এম.এ পাশ করেছে সে। আপাতত মানিকতলায় একটি প্রাইভেট  কোম্পানিতে কাজ করে সে। বাবা সুশান্ত মিত্র প্রতিদিন অফিসে যাবার পথে মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে যান। যদিও বাবাকে কখনও মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি প্রিয়া। সেই কুড়ি বছর আগের কথাপ্রিয়ার জন্মদাতা বাবা নবারুণ গুহ যান দুর্ঘটনায় মারা যান। মা বিপাশা দেবীর তো শিরে বজ্রাঘাত। সংসারে  হাল ধরার কেউ নেই। বাসনমাজা থেকে শুরু করে দু-তিন বাড়িতে  ঝি -এর কাজ করেও মা-মেয়ের খরচ মেটাতে ব‍্যর্থ হন তিনি। শ্রীরামপুরে ফ্ল‍্যাটে কাজ করার সময়ই সুশান্ত বাবুর সাথে পরিচয় হয় বিপাশা দেবীর। সুশান্ত বাবু বিয়ে থা করেননি। পরিচয় থেকেই পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন তিনি। সাত বছরের শিশু প্রিয়া পেল তার নতুন পিতাকে।

   যদিও নবারুণ বাবুর জায়গায় প্রিয়া তার নতুন বাবাকে কখনও বসাতে রাজী ছিলেন না। মা-বাবার ভালোবাসা পেলেও তার মনে যেন একটা বরাবরই অতৃপ্তি ছিল। বাবার অপত‍্য স্নেহ থেকে সে সদাই নিজেকে বঞ্চিত মনে করত। স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠী অয়নের সাথে তার ভালো বন্ধুত্ব হয়। পরবর্তী সময়ে অয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে। বিপাশা দেবীও তাকে পছন্দ করেন। হাতের ছেলে বলে কথা। অয়নকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রিয়া। সেদিন হঠাৎ অফিস থেকে ফেরার পথে চৌমাথায় অয়নের রক্তবমি হয়। কি ব‍্যাপার! সহকর্মী বাদল তাকে ট্রাক্সি কর নিয়ে যায় পাশ্ববর্তী আরোগ‍্য নিকেতনে। চিকিৎসায় ধরা পড়ে অয়নের ব্লাড ক‍্যান্সার। প্রাইমারী স্টেজ। চিকিৎসকদের পরামর্শ একটি জটিল অস্ত্রোপচারে সেরে যাবে।

     অন‍্যদিকে অয়ন আর প্রিয়ার আশীর্বাদের দিনও ঘনিয়ে আসছে। যথারীতি শুরু হল অপারেশন। আচমকা প্রয়োজন হল রক্তের। অয়নের রক্তের গ্রুপ বি-নেগেটিভ। বিরল গ্রুপ। নার্সিংরুমে এই গ্রুপের রক্ত নেই। প্রিয়া বার বার বন্ধুবান্ধবদের ফোন করেও রক্ত পাচ্ছে না। অয়নের বড় ভাই বেহালা থেকে এসেছেন। কিন্তু রক্ত  নেই। উপস্থিত সকলেরতো মাথায় হাত। প্রিয়ার দুচোখে জল। তবে কি আক্ষরিক অর্থে তার আর অয়নের সাথে সামাজিক গাটবন্ধন হবে না। এমন সময় অপারেশন রুমের আলো নিভে গেল। হাসিমুখে  বেরিয়ে এলেন ডা: বসু। অপারেশন ভালো হয়েছে। তবে কে দিয়েছে রক্ত? দৌড়ে গেল প্রিয়া। রক্ত দিয়েছেন সুশান্ত মিত্র। সারাজীবন যাকে প্রিয়া ঘৃণা করত, ঐ লোকটা কিনা শেষপর্যন্ত তার জীবনসঙ্গীকে বাঁচিয়েছেন। হায়রে বিধাতার একি বিধান। ছুটে গিয়ে প্রিয়া জাপটে ধরল বাবাকে। লুটিয়ে পড়ল  সুশান্ত মিত্রের চরণে। আজ সে অনুতপ্ত। ক্ষমা করে দাও বাবা। আমি যেন সারাজীবন তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বাবা বলল-তোর খুশি তোকে ফিরিয়ে দিয়ে আমিও খুশি। প্রকৃত ভালোবাসার প্রতিদানও মহৎ হয়।

Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.