![]() |
| শামিমা এহেসানা |
(বিষয়- আমার আপনার আশে পাশের কোনো এক বিরল মানবিকতার গল্প)
গলি রাস্তার ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে রংচটা রাজবাড়ি। বাড়ির সামনের ডাকবাক্সে বাড়ির মালিক এবং তাঁর স্ত্রীর নাম খোদাই করা, কিন্তু 'রাজবাড়ি' শব্দের কোনো উল্লেখ নেই। তবে পঞ্চাশ বছরের পুরোনো এই রাজকীয় অট্টালিকা লোক মুখে 'রাজবাড়ি' নামেই পরিচিত।
ঝিলাম এর অফ ডে ছিল সেদিন। শপিং-সিনেমা সেরে যখন ফ্ল্যাটে ফিরছিল, তখন বিকেল। রকে বসে আড্ডা দিচ্ছে কাকিমাদের দল আর কয়েকজন ছোটো ছেলে পুলে। এই কাকিমাদের একজন ডাক দিল ঝিলামকে উদ্দেশ্য করে। "কি ম্যাডাম? কোথায় যাওয়া হয়েছিল?" মনে মনে অল্প বিরক্ত ঝিলাম হাসতে হাসতেই সবার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কুশল বিনিময় করছিল। ওদের সাথে কথা বলতে বলতেই ঝিলামের চোখ গেল রাজবাড়ির দিকে। আলোচনা অন্য দিকে ঘুরিয়ে, ঝিলাম জিজ্ঞাসা করল, "আচ্ছা, রাজবাড়ির কেও আড্ডা দেয়না এখানে? সত্যি বলতে কোনোদিন ওবাড়ির জানলা দরজায় কাওকে মুখ বাড়াতেও দেখিনা। বাইরে থেকেও কোনোদিন কাওকে ঢুকতে দেখিনি। এবাড়িতে আদৌ কেও থাকেন?"
বেশ কয়েকজন মুখ টেপাটেপি করে হাসতে শুরু করল। তারই মধ্যে ঝিলামকে ম্যাডাম বলে যিনি ডাক দিয়েছিলেন, তিনি বললেন, "ওদের হাই ফাই ব্যাপার। রাজবাড়ি বলে কথা। ইস্ত্রি করা জামদানি আর খদ্দর ছাড়া ওর ঘর থেকে বেরোয় না। পুরোনো জমিদার তো। আমাদের মত গরীব গুর্বোদের সাথে ওঠাবসা নেই ওদের।" আর একজন উৎসাহী মাসিমা বলে উঠলেন, "আর কি বলব তোমাকে, ওরা জানো তো, ভীষণ কিপ্টে। কোনোদিন ছেলে মেয়ের হাতে একবাটি পায়েস পাঠালে, খালি বাটিটা হাতে ধরিয়ে দেয়। কোনোদিন পাল্টা কিছু পাঠায় না। একদিন আমি গেছিলাম, এক কাপ লাল চা খাইয়েছিল, রাজকীয় একটা চিনে মাটির কাপে। তা একটা লেড়ো বিস্কুটও জোটেনি। পেল্লায় কিপ্টে মানুষ। "
সবাই একযোগে হেসে উঠল, একজন মাঝবয়সী মহিলা বললেন, "আমার ছেলের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিলাম। কি দিয়েছিল, জানো? একটা পুরোনো দেখতে কাঁসার ফুলদানি। এ যুগে এসব চলে? সত্যিই বুড়ো-বুড়ি কেমন বুদ্ধির মানুষ বুঝিনা।" হাসিটা বাইপাসের মত ব্যবহার করে সবাই অন্য টপিকে ঢুকে পড়ল। ঝিলাম ও সুবিধা মত কাকিমাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ফ্ল্যাটে ফিরল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। মা এর কথা মত পুজো না করলেও ব্যালকনিতে সকাল-সাঁঝে একটা ধূপ বাতি জ্বালিয়ে আসে ঝিলাম। ব্যালকনিতে পৌঁছে চোখ পড়ল রাজবাড়ির ডুমুর ফুলে। ডুমুর ফুল, মানে রাজবাড়ির রাজরানী, মিসেস মুখার্জি। মাথায় আঁচল দিয়ে বারান্দার তুলসী তলায় পুজো করছিলেন। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ঝিলাম ঘরে ফিরে এল।
ঠিক এক সপ্তাহ পর, ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁতেই, এলার্ম বেজে উঠল, স্ক্রিনে লেখা, অপারেশন রাজবাড়ি। ঝিলাম একটা সুপ বোল নিয়ে দৌড় দিল। মাথায় অল্প বিস্তর বদবুদ্ধি আর অনুসন্ধান এর ইচ্ছা নিয়ে রাজবাড়ির কলিং বেল বাজালো। বেশ কয়েকবার কলিং বেল বাজিয়ে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। বাধ্য হয়েই রাজবাড়ির পুরোনো কাঠের দরজার শিকলটা দিয়ে শব্দ করল। "আসছি।।।"একটা ক্লান্ত,বয়স্ক,কন্ঠ শোনা গেল। ধুতি পরা এক ভদ্রলোক এসে দরজা খুললেন। রাজপুত্ররা বয়স্ক হলে এমনই দেখতে হয় কিনা, ভেবে মনে মনে হাসল ঝিলাম।
ব্যাস্ত কন্ঠে ঝিলাম বলল, "জেঠ্যু আমি ঝিলাম। এই আপনাদের পাশের এপার্টমেন্টে থাকি। এখানেই একটা বেসরকারি ব্যানক এর ম্যানেজার। কাজের সূত্রেই এখানে থাকা। ভাবলাম, একবার আলাপ করে আসি আপনাদের সাথে। তাই চলে এলাম।" বৃদ্ধ সবটা শুনে হাসি মুখে স্বাগত জানালেন ঝিলামকে। অন্দরমহলে আসার অনুরোধ ও করলেন। কিন্তু ঝিলামের আব্দার শুনে ভদ্রলোকের মুখের হাসির রেখাটা মিলিয়ে গেল। যেন সোনা-দানা চেয়ে বসেছে কেও।
ঝিলাম বলল, " আসলে চা বসাতে গিয়ে দেখলাম, চা পাতা শেষ। তাই ভাবলাম এবাড়ি থেকে ধার নিয়ে যায়, এই সুযোগে আলাপ হয়ে যাবে আপনাদের সাথে। তা জেঠিমা কোথায়?" গম্ভীর চেহারায় বৃদ্ধ বললেন, "ভেতরেই আছে। তুমি ভেতরে এসো।" খেজুরে আলাপ করতে ঝিলাম ছোটো থেকেই ওস্তাদ। তাই আলাপ পরিচয় করতে ওর ছুতোর অভাব হয় না। রাজরানির সাথেও আলাপ করতেও ঝিলাম এর বেশি সময় লাগলো না।
চা পাতার কথা বলতেই বৃদ্ধা বললেন, "চা পাতা নিয়ে গিয়ে চা বসাতে হবে কেন? তুমি বসো। আমি চা করে আনছি। তবে দুধ শেষ। তোমার লিকার চা খেতে অসুবিধা হবে না তো?"
ঝিলাম এর পাড়ার কাকিমাদের কথা মনে পড়ে গেল। মনে মনে ভাবল, "সত্যিই কিপ্টে?"
চা পাতা চাইতে গেলে কত বড় বাটি নিয়ে যেতে হয়, ঝিলাম এর গুগল সেটা বলে দেয়নি। সুপ বোলটা নিয়ে মিসেস মুখার্জি ভেতরে গেলেন। ঝিলাম এই সুযোগে গোটা ঘরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা মাপতে শুরু করেছে। গোটা ঘরটা প্রাচীন আসবাবে ভরা। চেয়ার-খাট সবই রাজকীয়। নতুন মডেলের কিছুই চোখে পড়ল না। ঝিলাম কৌতুহল না সামলাতে পেরেই, বিনা অনুমতিতে বাড়ির ভেতরে পা দিয়েছে। একটা রান্না ঘর ছাড়া সব ঘরেরই দরজা বন্ধ। দু একটা ঘরে তালা দেওয়া।
রান্নাঘরে নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল ঝিলাম। ভয় ডর ঈশ্বর তার স্বভাবে লেখেনি। যা দেখল, ঝিলাম, তাতে রাজবাড়ির মিথটা ভেংচে গেল। একটা কয়লার উনুন, কিছু কাঁসার বাসনপত্র, একটা কাঠের ঝুড়িতে ছোটো ছোটো মশলার কৌট। পুরোনো কয়েকটা চাল,ডাল রাখার জার। সব কিছুই জরাজীর্ণ, জৌলুসহীন।
কোনো ফ্রিজ, চিমনি চোখে পড়ল না। খিদে পেলে, গোটা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও অন্ন মিলবে না। বিচার বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার বৃদ্ধ-বৃদ্ধার কথোপকথন এ কান পড়ল ঝিলামের।
বৃদ্ধা বলছেন, "এই বাটির আধ বাটি চা পাতাও নেই। মাস কাবারি বাজারে পঞ্চাশ গ্রাম চা পাতা আসে। কি বলব মেয়েটাকে?" বৃদ্ধ বললেন, "যে দু চার চামচ পাতা আছে, তাই দিয়ে দাও। বলবে, আমাদেরও চা পাতা শেষ হয়ে এসেছিল। আমরা না হয় আবার পরে চা খাব। কি? আমাদের নিজের সন্তান হলে কি না করতে পারতাম?" মিসেস মুখার্জি হাসি মুখে বললেন, "একদম ঠিক বলেছো। আমি তাই করছি।"
ঝিলাম এর শব্দ শেষ। গলা শুকিয়ে আসছে। আর চোখ ভিজছে ক্রমশ। নিঃশব্দে ঝিলাম ভিতরের ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে পড়ল। কানে ফোনটা ধরে জোরে জোরে কথা বলতে শুরু করল। "হ্যালো! কোথায় তুই? সেকি! এখন আসছিস? এত কিছু কিনতে গেলি কেন? আচ্ছা বেশ আয়। আমি চা পাতা নিতে এসেছিলাম পাশের বাড়ির জেঠিমার কাছ থেকে। তাহলে আর নিচ্ছি না কিন্তু। ঠিক আছে, তুই আয়। আমি এখনই ফিরছি।"
ঠিক পরের দিন সকাল দশটায় রাজবাড়ির কড়া নড়ছে দেখে বৃদ্ধ এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলেন, ক্যুরিয়ার বয় দাঁড়িয়ে। বৃদ্ধকে দেখে সে বলল, "ডেলিভারি আছে আপনাদের।" ছেলেটির কথা শেষ না হতেই বৃদ্ধ বললেন, "ভুল হচ্ছে কোথাও আপনার৷ আমাদের কিছু আসার কথা ছিল না।" ছেলেটা বলল, "মিঃ নন্দকুমার মুখার্জি আর নয়না মুখার্জির নামে ডেলিভারি। গলি নম্বর সাত এর বি। আমার কাজ এটাই কাকা। ভুল করলে রুজি রুটি চলবে?"
কৌতুহল চেপে না রেখে বৃদ্ধ বললেন, কে পাঠিয়েছে দেখো তো।"
ছেলেটি বলল, "সুহাসিনী দত্ত রায়, বহরমপুর থেকে। এর বেশি কিছু লেখা নেই।"
বৃদ্ধ এমন নামের কাওকে চেনেন না বলে জানালেন ছেলেটিকে এবং সেটি গ্রহণ করতে চান না। তাও স্পষ্ট করলেন। এবার ছেলেটা রেগে গিয়েই বলল, "কাকু, আমার কাজ ডেলিভারি দেওয়া। আপনার নামে, আপনার ঠিকানায় ডেলিভারি আছে। আমি আপনাকে দিয়ে গেলাম। এরপর আপনি এটা রাখবেন, নাকি নদীর জলে ফেলবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।"
বৃদ্ধ খানিকটা অপমানিত বোধ করে, চুপ করে গেলেন। একটা বড় পার্সেল উঠোনে রেখে চলে গেল ছেলেটা। মিস্টার এবং মিসেস মুখার্জি বিস্তর বিস্ময় নিয়ে প্যাকিং খুলে দেখলেন, একগাদা শুকনো খাবার ভরা। চাল, ডাল, ময়দা, বিস্কুট, গুঁড়ো দুধ, চিনি, পেস্তা-বাদাম, কি নেই। হাসি আর বিস্ময় মুখার্জি দম্পতির মুখে-চোখে লুকোচুরি খেলতে শুরু করেছে। অনেক ভাবনার পর তারা জিনিসপত্র ঘরে তুলে রাখলেন। কে পাঠিয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর না মিলতেই, প্রতি মাসের শেষে ওই একই দিনে সুহাসিনী দত্ত রায় এর আবার একটা পার্সেল চলে আসত। বেশ কয়েকবার তাতে অল্প টাকা পয়সাও পাঠানো হয়েছিল। সম্ভবত, চিকিৎসা এবং অন্যান্য আনাজ কেনার জন্যই। পুজোতে জামদানী শাড়ি আর খদ্দরের পাঞ্জাবিও এসেছে।
ঝিলামের আর সেভাবে যাওয়া হয়নি রাজবাড়িতে। তবে, একদিন নিজেরই জন্মদিন উপলক্ষে কেক নিয়ে গেছিল। মিঃ এবং মিসেস মুখার্জির সাথে গোটা সন্ধ্যা বসে আড্ডা দিয়েছে। আর দুধ চা ও খেয়ে এসেছিল সেদিন।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন