গতকাল বিকেলে
রিম্পার ফোনটা পাওয়ার পর থেকেই মেজাজটা খিঁচিয়ে আছে অদিতির। বাড়ি ফিরে হাত মুখ না
ধুয়েই রিম্পার বইয়ের আলমারি খুলে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো এবং পেয়েও গেল
প্যাকেটটা। -এই তো ডট পেনটা। ইঙ্ক পেনটা কবে থেকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিস? রিম্পা এতক্ষণ
কাচুমাচু মুখ করে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকা মায়ের প্রশ্নে কেমন যেন থতমত খেয়ে
গেল। -লাস্ট থ্রী ডেস। গতকাল রিম্পা যখন ফোন করলো অদিতিকে, ও তখন অফিসে। ফোনে খুব কাঁদছিল রিম্পা, মা, স্কুলে বেঙ্গলি মিস আমাকে চোর বলেছে। আমি নাকি
সায়নির পেন ছুরি করেছি। আমি যত বলছি এই পেনটা আমার মামা আমার বার্থডেতে দিয়েছে। সায়নি বলল ওর পেন্সিল বক্স থেকে আমি নিয়েছি আর মিস
সেটাই বিশ্বাস করলো। কাল তোমাকে স্কুলে ডেকেছে। আদিতির মাথায় রক্ত চড়ে গেছিল। -তোমাকে অত দামী পেন নিয়ে স্কুলে যেতে মানা করেছিলাম না? ফোনের অপর প্রান্তে
রিম্পা তখন কেঁদেই চলেছে।
আজ অদিতি আর অফিসে গেল না। তাড়াতাড়ি তৈরি
হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আজ একটা বিহিত করেই ছাড়বে। মেয়েকে চোর বলাটা কিছুতেই
মেনে নিতে পারছে না। স্কুলে গিয়ে জানতে পারলো, সায়নি নামের সেই মেয়েটি আজ আসেইনি।
ক্লাস টিচারকে খুব রাগত স্বরে বলল, আমার মেয়ে যতক্ষণ না ওই পেনটা ফেরত পাচ্ছে, ততক্ষণ
ওর ইনসেন্সি প্রুফ হচ্ছে না। ক্লাস টিচার আশ্বস্ত করে বললেন তিনি ব্যাপারটা দেখবেন। রাগে
গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে এল স্কুল থেকে। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে লাগলো
এখন কি করবে? গতকাল অনেক রাতে শুভ্র বাড়ি ফিরলে ওকে বলল। তখন ও অত ক্লান্ত ছিল যে,
কতটা যে শুনল বোঝা গেল না। সকালে বেরনোর সময়ও কিছু জিজ্ঞেস করলো না। শুভ্রকে কি
জানাবে? যদি মিটিং-এ ব্যস্ত থাকে তাহলে তো ফোনটাও ধরবে না।
ঠিক তাই হল, আদিতির ফোন কেটে দিয়ে এস
এম এস করে বলল, বিজ়ি, কল ইউ লেটার। ফোনে টাইম দেখল অদিতি, এখন অনেকটা সময় আছে। অফিস কামাই
না করলেও হত। এখন বাড়িতে গিয়েই বা কি করবে? বাবা, মা বেঙ্গালুরুতে ভাইয়ের বাড়িতে
গেছে। নাহলে বাবা, মার সাথে দেখা করে আসা যেত। নিউ মার্কেটে ঘুরে এলে মন্দ হত না। কিছুক্ষণ ভেবে অদিতি
ঠিক করলো নিউ মার্কটেই যাবে। সেই মত রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকের বাস বা ট্যাক্সি
ধরতে হবে। বিকট শব্দে অদিতির একদম সামনে এসে একটা গাড়ি ব্রেক কষল। গাড়ি আর অদিতির
মধ্যে মাত্র আঙ্গুল চারেকের তফাত হবে। একে অফিস টাইম তার উপরে ব্যাস্ত বি টি রোড।
চারিদিক থেকে চিৎকার
চেঁচামেচিতে অদিতি কেমন দিশাহারা, থর্ থর্ করে কাঁপছে। ওদিকে যে গাড়িতে ধাক্কা লাগতে লাগতে বেঁচে গেল, তিনিও গাড়ির কাঁচ নামিয়ে যা নয়
তাই বলতে শুরু করলেন। অফিস টাইমে কার আর মাথার ঠিক থাকে! দেখতে পান না? চোখের
মাথা খেয়েছেন? কিছু হলেই তো পাবলিক আমাকেই ... কথা শেষ করতে পারেন না ভদ্রলোক। সামনে হতবাক মহিলাটিকে কেমন চেনা চেনা লাগছে তার। -অদিতি না? আদিতি!! এই যে এখানে! অদিতিও যেন চিনতে পেরেছে। -দিতি! দিতি!! ঝট্পট্ গাড়িতে উঠে এসো। ওঁকে একটু হেল্প করুন না, প্লিজ! এক্ষনি সিগন্যাল গ্রীন হয়ে
যাবে। উঠে এসো। ফাস্ট!! অদিতি কোনও রকমে টলতে টলতে গাড়িতে এসে বসে। মুহূর্তের
মধ্যে কী যে ঘটে গেল, ঠিক যেন ঠাওর করতে পারছেনা! সিগন্যাল লাল দেখেই তো পার
হচ্ছিলো। তাহলে কেন এমন বিপত্তি হল? আর কার গাড়ির সামনে এসে পড়লো? দিগন্তর ?!
-আরে রেলাক্স করে বসো। তুমি হঠাৎ ওরকম বিপদজ্জনক ভাবে রাস্তা পার হচ্ছিলে কেন? -আমি তো সিগন্যাল দেখেই...। কথা শেষ করতে পারলো না, এখনও হাঁপর টানার মত হাঁপাচ্ছে। আর একটু হলেই সব শেষ। চোখের সামনে রিম্পার মুখটা ভেসে উঠলো। বুকের মধ্যে মুচড়ে উঠলো। আমার কিছু হয়ে
গেলে মেয়েটার কি হত? কান্না আটকাতে গিয়ে গলাটা ব্যাথা করতে লাগলো। অফিস টাইমের
জ্যামে গাড়ি মন্থর গতিতে চলতে শুরু করলো। -এই রে, দ্যাখো তুমি কোন দিকে যাবে না
জেনেই চলতে শুরু করে দিলাম। অদিতি অনেক কষ্ট করে বলল, নিউ মার্কেট। আর মনে মনে বলল, দিগন্ত, তুমি কবে
জানান দিয়েছ যে তুমি কোথায় নিয়ে চলেছ? খড়-কুটোর মত ভেসে গেছি যেদিকে বাতাস বইয়েছ।
তুমি আজও একই রকম আছো, একটুও বদলাওনি। -ও গুড! অন দা ওয়ে। আমি পার্ক স্ট্রীট
যাচ্ছি। কি আশ্চর্য ভাবে দেখা হয়ে গেল, বলো? তারপর লেখা টেখা চলছে? না ইতি দিয়েছ?
-লিখতে
তেমন আর ইচ্ছে করে না, অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অদিতির বুকচিরে । -এই তোমার এক প্রবলেম। নিজের মুল্যায়ন করতে পার না। নিজে যে কিছু করতে পার
সেটাই বুঝে উঠতে পারলে না। এসব কথা অদিতির যেন কানে যাচ্ছে না। সে কোন ভাবেই
স্বাভাবিক হতে পারছে না। বুকের মধ্যে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছ। মাঝে মাঝে দিগন্তকে দেখছে
আড় চোখে। চুলে অল্প অল্প পাক ধরেছে, চশমার ফ্রেম বদলেছ। কিন্তু ঘড়িটা সেই একই আছে।
এই ঘড়ি নিয়ে কত কি বলেছে অদিতি। দিগন্তর এক কথা, এটা থাক না, দিতি। মায়ের লক্ষ্মীর ঘট
ভাঙ্গা টাকায় কেনা ঘড়িটা ছাড়তে চায়নি। -কবে ফিরলে দেশে?
প্রশ্ন করেই অদিতি তাকিয়ে
থাকে দিগন্তর দিকে। যদি ড্রাইভ করতে করতে একটি বার তাকায় সে, যে চোখের গভীরতায়
একদিন সে হারিয়ে গেছিল। -এই মাস ছয়েক হল। বাবা, মার বয়স হয়েছে। বাইরে গিয়ে থাকতেও
চান না। এক ছেলে হওয়ার এই প্রবলেম, বুঝলেন মিসেস অদিতি বাসু? একটা দীর্ঘশ্বাস
শুনতে পেল অদিতি। তবে কি ফিরে আসাটা দিগন্তকে মানসিক কষ্ট দিয়েছে? তবু সন্তানের
দায়িত্ব এড়াতে পারেনি। দিগন্ত কথাটা শেষ করে অদিতির দিকে তাকায়, সেই কৌতুক মাখানো
দৃষ্টি দুচোখে। অফিস টাইমে সেন্ট্রাল এভিন্যু-এর প্রায় প্রতিটি সিগন্যালেই দাঁড়াতে
হয় বেশ কিছুক্ষণ। ক্রসিং-এর লাল বাতি সবুজ হল। গাড়ি আবার মন্থর গতিতে চলতে শুরু
করলো। কিন্তু অদিতি চলেছে পিছনে আরও পিছনে। অফিসের বন্ধুদের সাথে কৌতূহল বশেই
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে একটা একাউন্ট খুলেছিল। নেহাতই মজা করে। প্রিয় সিনেমা –
মেঘে ঢাকা তারা, প্রিয় গান – রাবীন্দ্র সঙ্গীত, প্রিয় খেলা – ফুটবল, প্রিয় লেখক –
ও.হেনরি। কে জানত যত নষ্টের মূল হবেন এই ও.হেনরি!
অদিতির তখন ভরা সংসার। স্বামী, মেয়ে, শাশুড়ি। সংসার সামলানো, মেয়ের দেখভাল, স্বামীর নানা ফরমাশ, শাশুড়িমায়ের সেবাযত্ন।
শুভ্রর মত বিশাল না হলেও একটা ছোট খাটো চাকরিও আছে।
শুভ্র একটি বহুজাতিক সংস্থায়
বেশ উঁচু পদে আছে। চাকরী ক্ষেত্রে উন্নতি যত বাড়ে, পাল্লা দিয়ে দায়িত্ব বাড়ে। রাত
করে ফেরাটা যেন নিয়িম হয়ে গেল। আজও তো মাসের অর্ধেক দিন অফিস ট্যুরেই কেটে যায়। কিছু
বলতে গেলে ঝগড়াঝাঁটিতে রূপান্তরিত হয়। তাই চুপচাপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করে অদিতি।
কিন্তু দিনের শেষে মনটা একটা কাঁধ চায় অশ্রয় নেওয়ার জন্য। ক্লান্ত শুভ্রকে কখন বলবে?
আর শোনার সময়ই বা কোথায়? শুধু এক এক দিন শুভ্রর শরীরটা আদিতির শরীরের উপর উঠে আসে
শরীরের নিয়ম মেনেই। আর শুভ্র যখন থাকে না, ব্যলকনিতে বসে বসে দেখে, নিঝুম রাতে শহরটা যেন ধীরে
ধীরে ঘুমের কোলে ঢলে পরছে। অদিতি ঘর বার করে, বই পড়ে, সময় কাটতেই চায় না। কখনও
শুভ্র উপহার দেওয়া ল্যাপটপটা খুলে বসে। কাঁচা হাতে ইতি উতি ঘাঁটতে থাকে। আজব বস্তু
এই ইন্টারনেট। সারা পৃথিবীর খবর, সারা পৃথিবীর মানুষ যেন এক ছাদের তলায়। দূর আজ আর
দূরই নয়। যেন হাতের মুঠোয় ধরা গোটা দুনিয়া।
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট তো বিস্মিত
করে দেয় অদিতিকে। এখানে কত মানুষ, কত কথা, বন্ধুত্বর জন্য বড়িয়ে দেওয়া কত হাত!
মানুষ কি মনে মনে এতটাই নিঃসঙ্গ? কিছু দিনেই অদিতি বুঝে গেল কি করে বন্ধুত্ব করতে
হয়। কিভাবে ‘চ্যাট’ মানে টাইপ করে করে কথা বলতে হয়। ফ্রেন্ড লিস্টে কারো নামের
পাশে সবুজ আলো জ্বলে থাকলে, সেও এই সময় অনলাইনে আছে। তার সাথে চ্যাট করতেই পারে।
কিছু দিন আগেও অদিতির এসব কেমন যেন ধোঁয়াশা লাগতো। সে ইনবক্স চেক করে। কৌতূহলী
মাউস একটার পর একটা মেসেজে ক্লিক করতে থাকে। ‘হে বেঙ্কারের সুন্দরী কন্যে, আমাকে
কি মনে পড়ে? তোমার জন্য অত ভালো চাকরীটা খুয়িয়ে, অবশেষে জেলের ঘানি টানতে হল!’
ঝটিতে অদিতি উত্তর দেয়, তোমাকে কি ভুলতে পারি? তা কোথায় ছিলে এত দিন? ওঃ লোকটা ও. হেনরি গুলে খেয়েছে। বাহ, বেশ সুন্দর লিখেছে তো।
নামটাও সুন্দর ‘দিগন্ত’। অদিতি একবার, দুবার, বার বার পড়লো। পরের দিনটা চাপা অস্থিরতায় কাটল। দিগন্ত রিপ্লাই করবে তো, না করবে না!
ইনবক্সে
দিগন্তর মেসেজ দেখে অদিতির ভিতরটা তির্ তির্ করে কাঁপছিল। কেন যে এমন হচ্ছে সে
নিজেও বুঝতে পারে না। উত্তর দেয়, ফিরে উত্তর আসে। পেশায় সফট্অয়্যার ইঞ্জিনিয়ার
দিগন্ত বেশ আড্ডাবাজ লোক। কথা বলতে বলতে সময়ে টান পড়ে, কথা ফুরায় না। আবার পরের
দিনের অপেক্ষা। যেদিন দিগন্ত কোন কাজে ব্যস্ত থাকে, কথা বলতে পারেনা। সেদিনটা
অদিতির কেমন যেন কান্না পেতে থাকে। আর দশটা মানুষের মত নতুন সম্পর্কের জোয়ারে এই
অস্থিরতা? অদিতি বুঝে উঠতে পারে না। তবে একটা চোরা টান অনুভব করে। অদিতি একদিন লিখে
পাঠায় ‘অনেক দিয়েছ তুমি, আমার কাঁখের কলস ভরো ভরো। যদি পারো পদ্ম পাতার শিশির কণা
দিও, কপালে টিপ পরে নেব। একটা কলঙ্কের রাত দিও কাজল করে। ...!’ ফোনের অপর প্রান্তে
কবিতাপ্রেমী দিগন্ত যেন তখনই খুশিতে অদিতিকে জড়িয়ে ধরে।
ছোটোবেলায় স্কুল, কলেজ
ম্যাগাজিনে একটু আধটু লিখত। বিয়ের পর সব শিকেয় ওঠে। দিগন্তর ঐকান্তিক উৎসাহে ও
অদিতির মনের তাগিদে আবার লেখা শুরু করে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপাবার ব্যবস্থা
করে। একটা দুটো ছাপাও হয় কোথাও কোথাও। লেখা বেরলে দিগন্তর চোখ খুশিতে ঝলসে ওঠে। ভালবাসার অমোঘ নিয়মে দুটি মানুষ কখন যেন আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যায়! কী
নির্ভরতা একে অপরের কাছে! তাই যেদিন দিগন্তর কাছে নিজেকে সমর্পণ করলো, সেদিন রবি
ঠাকুরের ঘরে বাইরের নায়িকা বিমলার মুখের কথা মনে মনে আউরাল, ‘পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণে
কী প্রচণ্ড উল্লাস! নিজের সর্বনাশ করাই নিজের সবচেয়ে আনন্দ এই কথা সেদিন প্রথম
আবিষ্কার করেছিলুম’। দুটি বিহাহিত নারী পুরুষের এই সম্পর্ককে সমাজ ‘অবৈধ’ ‘পরকীয়া’র তক্মা দেবে।
অদিতি এসব শব্দের কোন তল পায় না। -দিতি ঘুমিয়ে পরলে নাকি? -কই নাতো! দিগন্ত রেয়ার
ভিউ মির্রে অদিতির দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, তোমার কি বিশেষ কোন কাজ আছে নিউ
মার্কেটে? -কেন বলতো? -না, আমরা তাহলে আমাদের সেই পুরনো কফি শপে বসতে পারি। এত দিন
পর দেখা হল। অদিতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তোমার অফিস নেই? -আছে মানে ছিল। এই ভাবে
দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি, তাই চলো না কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে নিই। দিগন্ত ইতিবাচক উত্তর
পাওয়ার আশায় অদিতির দিকে অপলক্ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। অদিতির মনও যেন পতঙ্গের মত ঝাঁপ দিতে চাইছে। মুখে বলল, ঠিক আছে তাই চলো। অতীত
যেন আজ ভর করেছে অদিতিকে কিছুতেই পিছু ছাড়ছেনা।
দিগন্ত যেদিন ফোনে বলল, দিতি দারুন একটা গুড নিউজ আছে। কম্পানি আমাকে ইউ.এস
পাঠাচ্ছে। অদিতিকে কেউ যেন সজোরে ধাক্কা মারল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কত দিনের
জন্য? -এই তিন চার বছর হবে। -এত দিন? মাথাটা যেন খালি খালি লাগছে। -ডোন্ট অরি বস!
দেখতে দেখতে কেটে যাবে। -কবে যেতে হবে? -দেখি ভিসা বানাতে যেটুকু সময় লাগে। -ও। আর একটাও কথা বলতে পারেনা। টেলিফোনের ওপ্রান্তের মানুষটির গলায় খুশির
ফোয়ারা। সারা শরীর ঝিম্ ঝিম্ করছে। এই মুহূর্তে ঠিক কেমন অভিব্যাক্তি হওয়া উচিত
বুঝে উঠতে পারে না। যে মানুষটা তার খুশির জন্য কিনা করে, আজ তার খুশিতে কেন খুশি
হতে পারছে না? কি করবে সে এখন? কিছু দিনের মধ্যেই দিগন্ত ব্যাস্ত হয়ে যায় ভিসা
ইত্যাদি নিয়ে। সারা দিনে দু-একবার ফোনে কয়েক মিনিটের জন্য কথা হয়। কোন দিন তাও হয়না।
অনলাইন হয়ে অপেক্ষা করে দিগন্তর নামের পাশের ধুসর আলোটা যদি সবুজ হয়। এসব কথা
দিগন্ত জানতেও পারে না। যত যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে, অদিতির বুকে মেঘ জমতে থাকে।
যাওয়ার আগের দিন দেখা হয়, খুব অল্প সময়ের জন্য। সেই শেষ দেখা, সেই শেষ স্পর্শ।
নিউ ইয়র্ক আর কলকাতা মধ্যে
প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টার পার্থক্য। অদিতির সকাল মানে দিগন্তর রাত আর দিগন্ত দুপুর
মানে অদিতির মধ্য রাত। এই সময়তেই দিগন্ত কথা বলতে পারে। সেই রকমই হচ্ছিল। দিগন্তর
কাজের চাপে তাও হত না। রাত জেগে, সকালে অফিস করতে অদিতিরও শরীর খারাপ লাগত ভীষণ। শেষে
ই-চিঠি আদান প্রদান শুরু হয়। দিনে দিনে ই-চিঠির দৈর্ঘ্য কমতে থাকে দুজনেরই। কোথায়
যেন একটা না পাওয়ার অতৃপ্তি দানা বাঁধতে থাকে। এত দিন দুটো তার টান টান করে এক
সুরে বাঁধা ছিল, তার দুটো যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন সুর খুঁজে পাচ্ছে না।
অদিতি ভাবতো দিগন্তর প্রাথমিক ব্যস্ততা কমলেই যোগাযোগ করবে। ধীরে ধীরে সে আশাও
ক্ষীণ হতে থাকে। অদিতি আর ল্যাপটপ নিয়ে বসে না। লেখেও না তেমন, লেখা আসে না। সেই
থোড় বড়ি খাড়া জীবনে আবার গা ভাসায়।
আজকের দিনটা অনান্য দিনের থেকে যে আলাদা বোঝাই
যাচ্ছে, নাহলে এই সময় নিউ মার্কেট চত্বরে গাড়ি পার্ক করা স্বপ্নাতীত। দিগন্তর মুখ দেখে
সে খুশি আন্দাজ করা যায়। -চলুন ম্যাডাম, আমাদের পুরনো ঠেকে যাওয়া যাক। অফিস
টাইমে কফি শপ বেশ ফাঁকা ফাঁকা। এখনো লাঞ্চ আওয়ারের ভিড় শুরু হয়নি। কত দিন পর এল এই
কফি শপে। একটুও বদলায়নি, চারপাশের বদলে যাওয়া হওয়ায় আজও কেমন
স্থির, অবিচল। কত দিন ওরা এখানে বসেছে। অদিতির সব লেখা আগে দিগন্ত পড়বে, কোন খট্কা
লাগলে, একসাথে বসে ঠিক করত । আজও তারা মুখোমুখি বসলো, কিন্তু কারো মুখ কোন কথা
এগোচ্ছে না। কথা হাতড়ে বেড়ায় দুজনেই। দিগন্ত গাড়ি থেকে নেমে এইটুকু রাস্তা কেমন পা
টেনে টেনে হাঁটছিল। -তুমি বুড়ো হয়ে গেলে দিগন্ত! -তা বয়স তো কম হল না। তুমি কিন্তু
সেই একই আছো, একই রকম সুন্দরী।
দিগন্তর চোখে কিছু একটা ছিল, চোখ নামিয়ে নিল অদিতি।
একটা চোরা অস্বাস্তি ঘূণপোকার মত মাথার মধ্যে বাসা বুনে যাচ্ছে। কফির চুমুকে সেই অস্বস্তি
কাটাতে চাইছে। কত কথা মনের এ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ও দেয়ালে গিয়ে পড়ছে। কেন এমনি
করলে দিগন্ত? কি করে ভুলে গেলে তোমার দিতিকে? চোখটা জ্বালা করছে। নাহ্ অদিতি
কাঁদবে না। এখন কান্নাও আর আসে না। সামনে বসা দিগন্তও চুপ করে আছে। কিছুই কি বলার
নেই? স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অদিতি বলল, তোমার ইউ.এস ট্যুর কেমন হল? -সে এক মস্ত ইতিহাস। আমি তো নিউ ইয়ার্কে থাকতাম, হারিকেন
আসছে তোমাকে ই-মেল করে বলেছিলাম না? -করেছিলে বুঝি? -বাহ, ই-মেল করে বলেছিলাম না!
টিভিতে, নেটে সমানে বলছে যে দুদিন পাওয়ার থাকবে না, জল থাকবে না। খাবার ও খাবার
জলের ব্যাবস্থা, বাথ টবে জল ভরে রাখা ইত্যাদি করে রাখতে।
আমি তো মার্কেট থেকে
মাত্র পাঁচ লিটার জল পেয়েছিলাম, একটু পরে গেলে সেটাও পেতাম না। তারপর টিভিতে বলল
আমরা যে জায়গাতে থাকতাম সেখানটা ইভ্যাকুয়েট করে দিতে হবে। অত রাত, হাজার হাজার লোক প্রান বাঁচানোর জন্য প্রানপনে ছুটছে। আমিও ছুটছি। সে
কি ভয়ঙ্কর অবস্থা, যেন তুমি তোমার মৃত্যুঘন্টা শুনতে পাচ্ছো। একটা বাস সামনে দেখতে
পেয়ে আমি দৌড়ে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলাম। আমার শরীরের উপর দিয়ে কতগুলো মানুষ ছুটে গেল,
ব্যাস এইটুকুই জানি। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হাসপাতালে, বাঁ-পায়ে ট্রাকশন দিয়ে
ঝুলিয়ে রেখেছে। আমার ওয়ালেট আর মোবাইল দুটো কিছুই নেই। কাউকে যে কোনো খবর দেবো
তারও উপায় নেই। পাক্কা দেড়মাস ওই ভাবে হাসপাতালে থেকে, বাড়ি ফিরে ই-মেল করে করে
কিছু নম্বর উদ্ধার করা গেল। অনেক নম্বরই হারিয়ে গেছে। অনেক মানুষ হারিয়ে গেছে। অনেকে হয়তো ধরা দিতে চায়নি বলেই হারিয়ে গেছে। জানো,
একটা সময় অনেক অভিমান জমা হয়েছিল। যাদের খুব কাছের মানুষ ভেবেছিলাম, তারা একটিবার
খোঁজ নিল না?
একটা লোক কি হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে? এখন সেই কষ্টটা আর নেই, এখন
সব ঠিক হয়ে গেছে। পরে বুঝেছি, কেউ যদি ইচ্ছে করে হারিয়ে যায়, তাকে কি খুঁজে পাওয়া
যায় বলো? দিগন্ত ঠিক কি বলতে চাইছে অদিতি বুঝে উঠতে পারল না। দিগন্তর চোখে একটা
যন্ত্রনা ছিল যা অদিতিকেও ছুঁয়ে গেল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় অদিতি। ভাবে থাক,
কি হবে পুরনো কথা তুলে? দিগন্ত তো আমার বাড়ি, অফিস সবই চিনতো, কোনো দিনও খোঁজ
নিয়েছে? অভিমান কি দিগন্তর একার আছে আমার নেই? -চলো ওঠা যাক। মেয়েটার স্কুল থেকে
ফেরার সময় হয়ে গেল। -ওর ঠাম্মা আছেন তো? ওনার কাছেই তো থাকে। -তবু আজ যখন অফিসে
যাইনি, একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। -বেশ চলো, আমি তোমাকে বাড়ির কাছে যেখানে ছাড়তাম
সেখানেই ছেড়ে দিই? -ঠিক আছে।
সারা রাস্তা টুকরো টুকরো কথাতে কেটে গেল। অদিতির
বাড়ির কাছে দিগন্ত গাড়ী থামালো। গাড়ীর দরজা খোলার আগে অদিতি একবার ভাবলো দিগন্তর
ফোন নম্বর চেয়ে নেয়। তারপর কী ভেবে দরজা খুলে নেমে পরলো। দিগন্ত অপলকে তাকিয়ে আছে
অদিতির দিকে। অদিতি আলতো হাত নেড়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চললো। একটু একটু করে দিগন্তর চোখের থেকে অদিতি সরে যাচ্ছে দূরে আরও দূরে, শেষে
মিলিয়ে গেল। ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ছে অদিতির বুকে। বাড়ি ঢুকে রিম্পার স্কুল
সমন্ধীয় নানা প্রশ্ন ও ঠাম্মার নাতনীর নানা অভিযোগ শুনে নিজের ঘরে ঢুকলো। ল্যপটপ
খুলে বসলো, অনলাইন হতেই চোখের সামনে খুলে গেল ইনবক্স। থর্ থর্ করে কাঁপছে অদিতি,
দিগন্তর ই-মেল, একটা দুটো না, অনেক অনেক। মাউস একটার পর একটা ই-মেলে ক্লিক করে
যাচ্ছে। এত দিনের ঘণীভূত অভিমানের বাস্পপুঞ্জ, শ্রাবনধারার মত বেয়ে পরছে নরম গাল
বেয়ে। অদিতি বসে আছে খোলা ল্যপটপের সামনে, দিগন্তর নামের পাশে ধূসর আলোটা সবুজ হওয়ার অপেক্ষায়।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন
(
Atom
)

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন