ব্রিটিশের শুরুটা একবার দেখে নেওয়া যাক। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ নবাব সিরাজদৌলা, কোম্পানির হাতে পরাজিত হলে কার্যত ব্রিটিশ শাসনের সূচনা ঘটে। এবং এর ব্যাপ্তি ধীরে ধীরে সারাভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ইংরেজ শাসনের হাত ধরে নব্য এক সমাজের চালচলন ঢুকে পড়ে বাঙালির অন্দর মহলে। শিক্ষার বিস্তারে এই পরিবর্তনের হাওয়া বেশ উপযোগী হয়েও ওঠে। ব্রিটিশ শাসনের পরিকাঠামোগত উন্নতির জন্য ভারতীয় বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের মধ্যে বাঙালি অগ্রগামী হয়ে ওঠে। ব্রিটিশের শাসনকে আধুনিক ভারতের রূপকার বললেও অত্যুক্তি হয় না। কেননা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালির মান্ধাতার আমলের সামাজিক কাঠামো ভেঙে আজ যে আধুনিক কাঠামোর উন্মেষ দেখতে পাই, তা মূলত ব্রিটিশদের উচ্চশিক্ষা ও পরিণত মানুষিকতার পরিচায়ক। বলে রাখা ভালো, এহেন বক্তব্যের জন্য আমি মোটেই ব্রিটিশদের সমর্থক নই।
ব্রিটিশ আমলে বাঙালি রেনেসাঁর যে উন্মেষ ঘটেছিল, রাজা রামমোহন রায়, যে সময়ের একজন পথিকৃৎ মহামানব। তিনি যে সময় সতীদাহপ্রথা রদ করার জন্য প্রাণপাত লড়াই করছিলেন, সেই সময় ব্রিটিশ শাসনের উন্নত আইন ও বিচার ব্যবস্থা না থাকলে এমন একটি অমানবিক হিন্দুপ্রথাকে রদ করা সম্ভব হতো না। ব্রিটিশ শাসনের মানবিক নীতি, তৎকালীন হিন্দুসমাজের এ হেনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজকে পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা দিয়েছে, তা আজও মূল্যানের দাবি রাখে। হিন্দু রক্ষনশীল ব্রাহ্মণ সমাজের অত্যাচারে নিম্ন বর্ণের সাধারণ হিন্দুরা যখন নিষ্পেষিত হচ্ছিলো, তখন ব্রিটিশ শাসনের সময়কাল যেন এক দৈবদূতের মতো আশীর্বাদ হয়ে ধরা দিয়েছিলো বৃহৎ হিন্দু সমাজে।
রাজা রামমোহন বাঙালি হিন্দু সমাজের সর্বাধিক প্রিয় মানুষ। যিনি হাজার বছরের বঞ্চিত হিন্দু জাতিকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায় মারা যান ১৮৩৩ সালে, আর বিদ্যাসাগর জন্ম নেন ১৮২২ সালে। রামমোহনের জীবদ্দশায় নবাগত এক অনন্য প্রতিভাধর বাঙালির বেড়ে ওঠায় তৎকালীন সমাজ কতটা উপকৃত হয়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যেন রামোহনের এক ধারাবাহিক আকৃতি। রামমোহন রায় সতীদাহপ্রথা রদ করিয়েছেন বটে, তা কিন্তু বাস্তবে রূপ নিতে সময় লেগেছে অনেক। সতীদাহপ্রথা রদের ফলে সমাজে ক্রমাগত বেড়ে ওঠা বিধবাদের সংখ্যা। এবং এই পরিস্থিতি হিন্দু সমাজকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলছিলো।
বলে রাখা ভালো, আমার এ লেখায় পূর্ববঙ্গের তৎকালীন পরিস্থিতি সম্পর্কেই আলোচিত হচ্ছে না। কেননা, ঈশ্বরচন্দ্রের সময়কালে পূর্ববঙ্গেও বাঙালি রেনেসাঁসের মনীষীদের উপস্থিতি ছিল, যেমন লালন ফকির। কিন্তু এখানে আমি সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো না। আমার আজকের আলোচনা মূলত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়েই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে ঊনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্করক ও গদ্যকার বলেই আমরা জানি। তিনি সংস্কৃত ভাষার পন্ডিত ছিলেন। সাহিত্যেও তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়ও তিনি পন্ডিত ছিলেন। সে কারণে তিনি প্রথম জীবনেই ``বিদ্যাসাগর'' উপাধি পান।
আরেকটি বিশেষ বিষয়ে উল্লেখ করা দরকার। নতুন প্রজন্ম কতটা জানে, বা আদৌ জানে কিনা সন্দেহ। আর তা হলো, মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসা ত্রুটিযুক্ত বাংলা লিপির সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ ও সরল-সাধারণ করে ব্যাবহার উপযোগী করেন তিনি। এবং রবীন্দ্রনাথের মতে, বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকারও তিনি। তিনি রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য `বর্ণপরিচয়।' রবীন্দ্রনাথ তাঁকে `বাংলা গদ্যের শিল্পী' বলে অভিহিত করেছেন। সাহিত্যের বিভিন্ন স্তরে তাঁর দক্ষ লেখনী বাংলাসাহিত্যে অমর সাহিত্য হিসেবে রয়ে গেছে আজও। যদিও পৃথিবী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে একজন সমাজ সংস্করক হিসেবেই জানেন।
সতীদাহ প্রথা রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় আইনিভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু সতীদাহ রোধের ফলে সমাজে বিধবা শিশু, মেয়ে ও মহিলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে লাগলো সমাজের অন্দরে। ফলে, সমাজের স্বাভাবিক গতি মন্থর হতে লাগলো। বিশেষ করে হিন্দু সমাজের। একদিকে বর্ণবাদ, কুসংস্কার, অন্যদিকে শ্রেণীবৈষম্য। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এমনি এক অতি দুঃসময়ে জন্মেছেন। সেই সময়ের অনেক বাঙালি বিদগ্ধ পন্ডিতেরা দু কলম লিখেই ক্ষান্ত হয়েছেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর ছিলেন সমাজবিপ্লবী। কাজেই তিনি তাঁর জীবনকে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের মোহনায় দাঁড় করিয়েছিলেন।
শিশু বিধবা সম্পর্কে পাঠকের মনে কি ধারণা রয়েছে? ১৭৫৭ সালের আগে থেকেই হিন্দুসমাজ বা ধর্মের এমন কিছু নোংরা রীতিনীতি ছিল, যা আলোচনা করলে বুঝা যায়, হিন্দুরা কতটা অসভ্য জাতি ছিল। শিশু বিবাহ বা একে আমরা প্রচলিত কথায় বাল্যবিবাহ বলতে পারি। বাল্যবিবাহের সূচনাপর্বের অনেক অপ্রিয় প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সুযোগেও হিন্দুরা এই বাল্যবিবাহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ব্রিটিশ আমলে হিন্দুসমাজের তুলনামূলক সমৃদ্ধি, তথা অবস্থানগত উন্নতি, আর্থিক স্বচ্ছলতা, শিক্ষার প্রসার, মোটের ওপর ব্রিটিশ আমল ছিল ভারতবর্ষের হিন্দুদের দুঃখভারাক্রান্ত দীর্ঘ পরাধীনতার সামাজিক, রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি। ব্রিটিশের প্রারম্ভিক ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সমাজের শ্রেণিবৈচিত্রের পরিবর্তন দেখা যায়। সেই পরিবর্তন হিন্দু বাঙালি সমাজকে বাবুয়ানা দিয়েছিলো। আর দিয়েছিলো নানা ধরণের অযাচিত বর্গী থেকে রক্ষা।
১৯২৯ সালে ভারতে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করার আইন পাশ হয়। সেখানে মেয়ের ন্যূনতম ১৫ এবং ছেলের ১৮ বছর বয়স বৈধ নির্ধারণ করা হয়। যা ১৯৭৮ সালে মেয়েদের ১৮ এবং ছেলেদের ২১ করা হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হয় ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর ৪০ বছরপরে বাল্যবিবাহ রদের আইন পাশ হয়। বলা চলে রাজা রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের ধারাবাহিক আন্দোলন ও সমাজ সংস্কাররের গতিধারায় হিন্দু সমাজের যে সামাজিক সভ্যতা গড়ে ওঠে তা ব্রিটিশ আমলেই। কেননা, নবাব সিরাজুদৌলার শাসনামলেও জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, ধনী হিন্দু ছিলেন। কিন্তু তাঁরা সমাজসংস্কারের পথে পা বাড়াননি। তার একটি গূঢ় কারণ ছিল। আজকের আলোচনায় তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
যাই হোক, হিন্দু বিধবাদের জীবন্ত অবস্থায় মৃতস্বামীর চিতায় তুলে দিয়ে আগুনে বারবিকিউ করা রদ করা গেলো। কিন্তু বেঁচে থাকা এই বিধবাদের উপায় কি হবে। বিদ্যাসাগর এদের পুনরায় বিবাহের রীতি চালু করতে চাইলেন। চাইলেই কি হয় ? রক্ষনশীল হিন্দু সমাজ বলেও তো একটা কথা আছে। এই হিন্দুরা বেঁকে বসলেন। বিদ্যাসাগরও তাঁর বিদ্যার জোরে অবশেষে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ডালহৌসি আইনটি প্রণয়ন করেন। এর আগে আরেক ব্রিটিশ লর্ড উইলিয়াম বেন্টিনের দ্বারা সতীদাহপ্রথার রদ হয়েছিল ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর। দুটি অমানবিক ধর্মীয় রীতি ও হিন্দু সামাজিক আইনকে বৃটিশের সহযোগিতায় বদলে দেয়া গেলো। এর আগের কোনো শাসকই কিন্তু হিন্দুজাতির অনুকূল ছিল না। ফলে কেউ সমাজ সংস্কারের কথা উচ্চারণ করতেও সাহস পায়নি।
বিদ্যাসাগরের মনের ভিতর এইযে মানবিকতা, সমাজের অন্তর্নিহিত সমস্যাকে অনুধাবন করা এবং তাকে নিয়ে বৈপ্লবিক লড়াই করা, এটাই তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে আসে। তিনি ১৮৫৫ সালে বহু গবেষণা করে একটি পুস্তক লেখেন বিধবাবিবাহের পক্ষে। প্রস্তাব নামের এই বইটিতে `পরাশর সংহিতা'র উদ্বৃতি থেকে তিনি প্রমাণ করে দেন, হিন্দুশাস্ত্র মতে বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ১৮৫০ সালে সর্বশুভকরী কাগজে তিনি বাল্যবিবাহের দোষ নামক একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৮৫৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় বিধবাবিবাহের সমর্থনে একটি প্রবন্ধ লেখেন। অবশেষে ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে কালীমতীদেবীর প্রথম বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষায়, চিন্তায়, মানবিকতায় যে মানুষটি সমগ্র জাতিকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছে, তাঁর অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল কিছু ধর্মীয় দালালরা। তথা ব্রাহ্মণ সমাজ ও তাঁদের দোসররা। কিন্তু বিদ্যাসাগরকে থামাতে পারেননি কেউ। তাঁর মতো উদার, দাতা ও শিক্ষাবিদ পন্ডিতকে ভারত কতটুকু মনে রেখেছে জানি না। কিন্তু বহির্বিশ্বে আজ হিন্দু মাথা তুলে কথা বলার যে মহিমা পেয়েছে, তা কিন্তু বিদ্যাসাগরের দান। বাঙালি ঐতিহ্য ও ইতিহাসের পটভূমিকায় বহু নাম রয়েছে, বহু গুণীজন তাঁরা নিজ নিজ মহিমায় সমাদৃত। কিন্তু উদাত্ত কণ্ঠে সহজ এক অনাবিল সত্য হলো এই, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভারতবর্ষের একটি মানবিক হিমালয়। যাঁর তুলনা শুধু সত্যিকার ঈশ্বরের সঙ্গে চলে। পৃথিবীর সর্বাধুনিক অবতার তিনি।

2 Comments:
সুন্দর একটা পোস্ট পড়লাম।বিদ্যাসাগর আমাদের সবার দেবতা স্বরূপ। যদিও মানুষ দেবতা নন। তবু ও একজন মানুষ কতোটা মানবিক হলে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেন বিদ্যাসাগর তার প্রমাণ। আপনার নিবন্ধ পড়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হলাম। মনিষীদের নিয়ে এমন সুন্দর সুন্দর ভাবনা উপহার আশা করি । প্রিয় সম্পাদক ও প্রাবন্ধিক এর জন্য হার্দিক শুভকামনা।
শুভেচ্ছান্তে আবদুস সালাম।
আপনি সুহৃদ। নমস্য। আপনার পাঠশেষে মূল্যবান মন্তব্য আমার কাছে পুরস্কারের মত।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন