পাওয়ার আনন্দে : সোনালী মুখার্জী

পাওয়ার আনন্দে : সোনালী মুখার্জী
পাওয়ার আনন্দে : সোনালী মুখার্জী 

পিকু ওরফে পল্লব ইংলিশ মিডিয়াম দিল্লীবোর্ড এর ক্লাস সিক্স এর  ছাত্র .(CBSE).বাড়িতে বা স্কুলে কোনো জায়গাতেই তার এতটুকু নষ্ট করার মতো সময় নেই ..কারণ সে রীতিমতো ভালো ছাত্র ..আর বাকি টাইম সে কম্পিউটার .আঁকা ..এসব নিয়েই ব্যাস্ত থাকে ..ওর বাবা বিশ্বনাথ বাবু ছেলে কে মাঝে মাঝে বাংলা টা শেখান ..ওর মা  নীতা দেবী তাতে রেগেই যান ..কিন্তু বিশ্বনাথ বাবু বলেন বাঙলির ছেলে বাংলা পরবে না গো ??আমরা কি  ইংরাজি স্কুলে পড়েছি ??আর যেখানেই পড়ি ..বাংলা আমাদের মা ..মাতৃভাষা ..লিখতে পড়তে শিখবে না ছেলেটা ??

এই  ভাবে প্রায় ই দুজনের কথা কাটাকাটি হয় ..এভাবেই চলছিল ..একদিন হলো কি ..পিকুর হঠাৎ জ্বর হলো ..তাই ডাক্তার দুদিন রেস্ট নিতে বললেন ..কারণ ওর ওপর খুব পড়াশোনার চাপ পড়ছে ..দুটো দিন অন্তত ওকে নিজের মতো থাকতে নির্দেশ দিলেন ডাক্তার ..নিতাদেবীর তো মাথায় হাত ...দু..টো ..দিন ??ছেলেটা যে সবেতে পিছিয়ে পরবে ??বিশ্বনাথ বাবুকে বলতেই উনি বললেন ..চিন্তা কোরো না ..আমাদের ভালো ছেলে ..বুঝদার ছেলে ..দেখবে সব সামলে নেবে ..আর ডাক্তার তেমন বুঝেছে বলেই না বলেছেন ??সব ঠিক হয়ে যাবে ..

এদিকে পিকুর তো দারুন আনন্দ ..দুটো দিন সব কিছু থেকে ছুটি ..কোনোদিন পায়নি জ্ঞান হওয়া অবধি ..আর খুব ইচ্ছে চিলেকোঠায় একটা বড়ো ট্রাঙ্ক আছে ..সেটাতে নাকি বাবার ছোটবেলার অনেক জিনিস আছে ..বাবা একদিন বলেছিলো খুলে দেখাবে ..কিন্তু কোনোদিন খোলাই হয়নি ..আজ দুপুরে মা শুয়ে পড়লে চুপি চুপি একবার দেখবে ওটাতে কি আছে .. 

যেমন ভাবা তেমন কাজ ..ওর মা ছেলে কে খাইয়ে শুইয়ে দিয়ে নিজে একটু রেস্ট নিতে ঘরে গেলেন ..আর পিকু ও আসতে আসতে ছাদের ঘরে উঠে এলো মা কে লুকিয়ে ..খুব সন্তর্পনে ট্রাঙ্ক এর ঢাকা টা খুললো ..আরিবাস ....বাবার ছোটবেলার জামা ?? আরে ...এটা কি ??একটা ভাঙা ব্যাট ?বাবা খেলতো ??আমার তবে খেলার সময় কোই ??আমায় কেন দেয় না খেলতে ??আমার বাবা মা ??এসব ভাবতে ভাবতে সব জিনিস বার করতে থাকে ..কি নেই ??নানা রখম হাতের কাজ এর নিদর্শন ..ফিতে ..ব্যাট বল .পেন্সিল কাটার ..ছোট ছুরি ..নানা রঙ পেন্সিল ..কি যে ভালো লাগছে ..বাবার ছোটবেলা টা কি সুন্দর ছিল ..মনটা আনমনা হয়ে যায় পিকুর ..ওর কেন বাবার মতো হলো না জীবন টা ??এসব ভাবতে ভাবতেই একটা প্যাকেট খরখর করে উঠলো ..ও চমকে তাকালো ট্রাঙ্কের ভিতরে .. আরে ..??এগুলো কি ??বার করে আনলো প্যাকেট টা ..বই ????বাবার বই ??কৌতূহলে খুলে বার করলো বইগুলো ..প্রথমেই "বাটুল দি গ্রেট "অনেকগুলো ..তারপর  চাঁদমামা ..শুকতারা ..টেনিদা ..এসব নানা রখম বই এ ভর্তি ..অনেকগুলো করে আছে ..এর পর বেরোলো ঠাকুমার ঝুলি ..ঠাকুরদার ঝুলি ..পঞ্চতন্ত্র ..এসব কি বই ??খুলে পড়তে শুরু করলো একটা ..কি দারুন ..ও নিজের মনেই হেসে অস্থির ..সব গুছিয়ে রেখে ওই বইগুলোর প্যাকেট টা নিয়ে আসতে নিচে নেমে এলো পিকু ..ঘরে শুয়ে পড়তে শুরু করলো বই গুলো ..পড়তে পড়তে সব কিছু ভুলে গেলো ও ..একদম শিশুসাহিত্যে ডুবে গেলো ..

কখন যে সন্ধে হয়ে গেছে ..ও টের ই পায়নি  ..হঠাৎ মায়ের ডাকে চমক ভাঙলো ওর ..নিতাদেবী বললেন ..এই দেখি ?তুই কি পড়ছিস ?ভয় ভয় বইগুলো মায়ের  হাতে তুলে দিলো ও ..এগুলো দেখে ওর মা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ..কোথায় পেলি এগুলো ??এগুলো তো ওই ছাদের ঘরে .....এই ..তুই একা ওখান থেকে ওগুলো এনেছিস ??এত সাহস তোর ??পিকু ভয়ে কোনো কথা বলতে পারছে না ..মা যে খুব বকবে ..কিন্তু ওই ট্রাঙ্ক টা যে ওকে অনেকদিন ধরে টানছিলো ..এভাবে না হলে মা কখনো ওগুলো দেখতে দিতো ?ও পড়তে পারতো এমন সব জিনিস ??ভাগ্গিস বাবা ওকে বাংলা পড়াটা শিখিয়েছিলো ??নাহলে তো জানতেই পারতো না ..বাংলার  এত মাধুর্য ..মনের ভিতর টা এগুলো পড়ার পড় ভোরে উঠলো এক আনন্দে ..ওর মা খুব বকলো ওকে ..তারপর বাবা এলে ব্যবস্থা করবে বলে চলে গেলো নিজের কাজে ..

খানিকটা পরেই ফিরে এলেন বিশ্বনাথ বাবু অফিস থেকে ..এসে ছেলের ঘরে গিয়ে দেখেন ছেলে শুয়ে আছে চুপ করে ..মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন ..বললেন কি রে ??পিকু ?মন খারাপ ?কি হলো ?মা বকেছে ?পিকু কিছু না বলে বাবার দিকে তাকালো ..জলভরা দুচোখে ..ওর বাবা বুঝলেন ..ব্যাপারটা বেশ গম্ভীর . ওর বাবা কিছু আর না বলে বাইরে এলেন ..খাওয়া দাওয়া করে রাতে নিতাদেবী ছেলের কথা সব বললেন ..বিশ্বনাথ বাবু বললেন .. নীতা তুমি এত রাগ করছো ওর ওপর ..কিন্তু ওই বইগুলো ওকে কতটা আনন্দ দিয়েছে একবার ভেবে দেখেছো ??ওদের আমরা যদি ওই বইগুলো পড়তে বাধা দিই ..পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের বাংলার সংস্কৃতি ..ভালোবাসা ..সর্বোপরি নিজেকে  বাঙালী হিসাবে চিনবে কিভাবে ??কি করে ভালোবাসতে শিখবে আমাদের বাংলা মা কে ??ওরা কি করে জানবে ??আমাদের দেশের মহামানবদের কথা ?ওকে একটু পড়তে দাও ..আর আমি বলি কি ..তুমিও একবার পড়ে ফেলো .সাথে আমিও ..বলে হেসে উঠলেন বিশ্বনাথ বাবু. .নীতা  দেবী শুয়ে শুয়ে বইগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে হারিয়ে গেলেন নিজের ছেলেবেলায় ..

একবার বইয়ের ভিতর টেনিদা লুকিয়ে পড়তে গিয়ে মায়ের কাছে কি মারটাই না খেয়েছিলো সে ..কত স্মৃতি বইগুলোর সাথে ..যেন নতুন করে আত্মিক যোগাযোগ হলো ..এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন নীতা দেবী ..সকালে দুজনেই ছেলের ঘরে গিয়ে দেখেন ছেলে উঠে বিছানায় বসে আছে ..ওরা দুজনেই গিয়ে পিকু কে আদর করে ওর হাতে তুলে দিলো বই গুলো ..বিশ্বনাথ বাবু বললেন এই নে ..আজ থেকে এই বইগুলো সব তোর ..তুই পড়বি ..আজ থেকে প্রতিদিন দু ঘন্টা করে তোর ছুটি ..সেই সময়টা তুই তোর ইচ্ছে মতো পড়ে ..খেলে কাটাতে পারবি ..আমরা দুজন এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি ..পিকু বিছানা  থেকে উঠে দৌড়ে এসে বাবা মা কে জড়িয়ে ধরলো ...সকলের মুখেই আনন্দের হাসি ..
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.