 |
| সমাপ্তি চৌধুরী |
অন্য ভুবন
সমাপ্তি চৌধুরী
রৌণক আজ সকাল থেকেই আঁকার খাতা নিয়ে বসেছে। ছবি আঁকতে ও বরাবরই ভালোবাসে। আজ ও অনেকটা অবসর পেয়েছে। বর্তমানে online class, online tuition,,,,,,এসবের চক্করে ওর সুস্থ মনটা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। স্কুল বন্ধ, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারছে না,,,,,,,ফলে স্বাভাবিক ভাবেই দৈনন্দিন জীবনে ছন্দপতন ঘটেছে।
রণ (মা আদর করে এই নামেই ডাকে) আজ কী আঁকছ? মায়ের কথা যেন কানেই ঢুকছে না, ও নিজের সৃষ্টিতে মগ্ন। ছেলেবেলা থেকে প্রকৃতির কোলে বড় হওয়ার সুবাদে গাছপালা, নদ নদী, বন-জঙ্গল, পশুপাখি,,,,, এগুলো খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওর সৃষ্টিতে রূপ পায়।
রণ ছেলেবেলা থেকেই খুব নরম প্রকৃতির। ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়লে ও কষ্ট পায়,,,,মা পুজোর জন্য বেশী ফুল তুললে ওর মন খারাপ করে। সবার সামনে মনের ভাব প্রকাশ করতেও কুণ্ঠা বোধ করে। যত খুনসুটি মায়ের সাথে। মা ঠিক ওর মন বুঝতে পারে।
সকালবেলা খবরের কাগজ আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটা পড়ার ব্যস্ততা এবং প্রথমেই শেষ পাতাটা পড়ে ফেলার মধ্যেই ওর আনন্দ। আসলে ওর তো খেলার খবর জানতেই আগ্রহ। মাঝে মাঝে এই নিয়ে বাবার সাথে গণ্ডগোল লেগে যায়,,,,,মা তখন পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। মাঝে মাঝে যখন ট্রেনে কাটা পড়া ছিন্ন ভিন্ন হাতিদের ছবিগুলো ওর চোখে পড়ে,,,,কী ভীষণ যন্ত্রণায় ও কুঁকড়ে ওঠে,,,,বিভিন্ন চোরাশিকারিদের অত্যাচারে বন্যপ্রাণীদের অসহায় মুখগুলো দেখে আর বাবাকে প্রশ্ন করে - এই পৃথিবীতে তো সবার বেঁচে থাকার অধিকার আছে,,,,,,তাহলে কেন এমন হচ্ছে? ওর ছোট্ট মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা,,,,,কখনো মা-কে শুধোয় -কেন রাস্তা তৈরি করতে এত গাছ কেটে ফেলছে সবাই,,,,,দেশে তো অনেক রাস্তা আছে, অনেক বড় বড় বাজার আছে,,,তবে কেন? যত গাছ সবাই কাটছে, কই তত গাছ তো নতুন করে লাগাচ্ছে না,,,,,ওর কচি মন,,,,আধুনিকতার বড় বড় পাঠ ওর পড়া হয় নি।
ওর মা ওকে বোঝায়- তুমি তোমার বাগানে গাছ লাগাও, জল দাও,তাদের পরিচর্যা কর।তাতে ওর মন শান্ত হয়।একদিন মালী দাদা গুলতী দিয়ে একটা কাঠবেড়ালি মেরেছিল বলে সাতদিন ও মালীদাদার সঙ্গে কথা বলে নি। রণ পাখী বড্ড ভালোবাসে,,,কিন্তু তাদের খাঁচায় বন্দী করে রাখাতে তার আপত্তি - অসীম আকাশে মুক্ত বিহঙ্গ দের বিচরণেই ওর আনন্দ।
অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ রান্নাঘর থেকে টেনে এনে মা কে নিজের পাশে বসিয়ে আঁকার খাতাটা দেখিয়ে বলে - এই দেখো মা - আমার সৃষ্ট পৃথিবী,,,,,,রণ র ছবিতে রূপ পেয়েছে - মুক্ত আকাশে পাখিদের অবাধ বিচরণ, জঙ্গলে নিশ্চিন্তে পশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, রাস্তায় মানুষের ভিড় নেই, ট্রাফিক আইন মেনে রাস্তায় খুব কম গাড়ি চলছে,,,,,,মা দেখল ছেলের কল্পনায় ফুটে উঠেছে এক অন্য পৃথিবী - যেখানে মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা সকলের সহাবস্থান। প্রত্যেকে মুক্ত,,,,সকলেই নিজেদের জীবনের নিয়ম মেনে বসবাসরত।
এমন হাজার হাজার রণর একই আকুতি - কেন এমন হয় না,,,,,,যদি সত্যি আমাদের পৃথিবীটা এমন হতো তাহলে কী ভালোই না হতো। মা ছেলেকে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে,,,,,,
"বন্যেরা বনে সুন্দর
শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।"
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন