সহজ কথা : শান্তময় গোস্বামী

সহজ কথা : শান্তময় গোস্বামী
সহজ কথা : শান্তময় গোস্বামী

কবিতা আমার জীবনে  বড় দেরিতে, বড় অকস্মাৎ এসেছে ... যেন প্রেম। আমার তিলে তিলে গড়ে তোলা রত্নখচিত রুদ্ধদ্বারটি উড়িয়ে পুড়িয়ে দিয়ে এসেছে সে। অমৃত ভাণ্ড হাতে তুলে দিয়ে বলেছে, "এই নাও হে, নিতেই হবে তোমায়"। তাই আমার 'শান্তনয়' নিছক নামের খোলশ ভেঙে বেরিয়ে আসে বাউলিয়া চোরা টান, আর নামের পাশে থির হতে চেয়েছে একতারার মোহন অথচ শান্তময় ফলকটি।  

অনেককিছু আছে-নেই-এর মাঝে তৃপ্ত-অতৃপ্তর দুলুনি চলতেই থাকে। ওজনের নিরিখে জীবনকে মাপতে মাপতে তলানি ছুঁয়েছি কবেই। সমীকরণ সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি বারবার, জানি, সাদাসাপ্টা ব্যালান্স শিট মেলানো সহজ নয়। হাতের উপর হাত রাখা কঠিন যদি, গরমিলের গরল গিলে ফেলাও সহজ ততোধিক। এখন অন্তত তাই মনে হয়। কাল দেখা হয়ে গেল ফের স্মৃতির সাথে। আমায় আজকাল ভুলে যাওয়া রোগে ধরেছে। হ্যাঁ,  কিছুটা ইচ্ছাকৃত, কিছুটা অজান্তে। যত বয়স বাড়ছে, ঘাড়ে চেপে বসছে স্মৃতিক্ষয়। প্রকৃতির প্রকোপ নাকি স্বেচ্ছাযাপন কে জানে! যদিও পরিত্রাণ অবশ্যই। মনে থাকেনা বক্রোক্তি, শ্লেষ, অপবাদসূচক অনুষঙ্গ। ভুলে যাই জন্মদিন, মৃত্যু। অন্তরাল আরামের। তাই এই অন্তরীন জীবন এখন অহংকার আমার। অহংকারী প্রতিপন্ন করে লোক, বিশেষ করে নাসিকার খর্বতা জনিত সমস্যায়। কী করে বোঝাই, নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। ধীরে ধীরে। যাপনপ্রলাপ.. অনুভূতিরা বড় সূক্ষ্ম। মাকড়সার জালের থেকেও। যে যত জড়িয়ে পড়ে, তার নিস্তার সম্ভাবনা ততই কম। তবু যতটুকু আছে, ভাগ বাঁটোয়ারা করে যদি কয়েকটা বছর আরো টানতে পারি।   

নদীর কাছে মানুষ সহজ। নদীর কাছে উগরে দেওয়া যায় দুঃখ, অসৎ জীবন, ব্যথার কতকিছুই। নদী জানে পলিমাটি হৃদয়। নদী জানে আঁকড়ে ধরা। সারল্যে অথবা ভালোবাসায়। আমারও একটা নদী আছে। যেমন থাকে সবারই। নদীর কাছে হাত পেতেছি,  নদী বলল ...  এসো,  চরায় বোসো,  খানিক গল্প করি,  চাইলে ঘর বাঁধতে পারো,  ছোট ছোট ঢেউ পাঠালাম।  পা ভিজিয়ো আলতো করে। স্মৃতির জীবন দীর্ঘ হয়,  দীর্ঘতর অবহেলা ঘরে,  ধূলির বসন! নদী তার ছেড়ে যাওয়া জলচলে রাখে আমার কীর্তিকথা,  সুখ শোক হাসি,  আনন্দ হতাশার ধাপ্পাবাজি …  স্মৃতি বড় অসহায়,  অমরতা নিয়ে,  এ ডালে সে ডালে বসে,  শাপগ্রস্ত ফিঙে! স্বপ্নে এক নদী আসে কেন?  ভৈরবী ভোরে?  অহেতুক জলছুঁই খেলাধুলা শেষে ও আমার বালকদিন… নদীরও কি মৃত্যুদিন হয় ? শোকসভা,  ফুলমালা ধূপগন্ধে স্মৃতি দু-মিনিট নীরবতা,  মৃদু কাশি,  ব্যস,  ঠিক আছে! 

কিছু সম্পর্ক আমরা তৈরি করেই আসি। চোখ খুলি। বাঁধন তৈরি হয়। শক্ত,নরম। তারপর সম্পর্ক তৈরি করি নিজেরাই। পছন্দমতো। কিছু থাকে। সাময়িক। কিছু স্রোতের মত আসে যায়। প্রয়োজন মিটে গেলে ছায়ারাও  ছেড়ে দেয় পথ... তবু বেঁধে বেঁধে রাখা। থাকা...। বড় হওয়া খুব কঠিন একটা প্রসেস। যে যতদিন পারে, ছোট থাকুক। বড় মন নিয়ে। সারল্য বাঁচিয়ে রাখা খুব কঠিন। স্পর্শ প্রবণতাও। পৃথিবীর সব শিশু ছায়ায় থাকুক। মায়ায় থাকুক। বাসযোগ্য ভূমি, সুস্থতার অধিকার, মানবতা ফিরে ফিরে আসুক! হয়তো আমাদের স্থায়ী পরিচয় নেই। আমরা শিকড় ছেঁড়া আসলে প্রত্যেকেই। ঝুরো মাটির বাসিন্দা। ঠিকানা হারিয়ে যায়। ঠিকানা খুঁজি। ঠিক ঠিকানায় পৌঁছতে লেগে যায় গোটা জীবন... জেগে থাকে শুধু এক মহাকাশ অপেক্ষা!  
 
এ শহরে যখন পলাশগন্ধ, তখন তুমি লিখো .....
লিখে রেখো নীল, লিখো কাশের মত মেঘ ...  
লিখো গেরুয়া রঙে ভয় নয় আর ...
ভালোবাসা বেঁচে থাকবে আসমুদ্রকাল !
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.