![]() |
| মঙ্গল কথা : মৃদুল শ্রীমানী |
লোকটির নাম মঙ্গল। ভারি চমৎকার নাম। মঙ্গল রিকশা চালাতো। আর তিন তিনটি কন্যা সন্তানের জনক। মঙ্গল পুরুষ সন্তান চায়। মেয়ে বাচ্চা হলে আবার স্বপ্ন দেখে বাবা হবে। পুরুষ সন্তানের গলায় বাবা ডাক শুনবে মঙ্গল। পুত্র সন্তান না হলে আর বাবা হবার কোন ফায়দা? পুৎ নরক থেকে উদ্ধার করবে বলেই না লোকে পুত্র চায়! তো মঙ্গলের এভাবেই তিন তিনটে মেয়ে। শেষেরটাকে আনবার সময় তার বৌ সব কাটিয়ে কুটিয়ে এনেছিল। বলেছিল খেতে দিতে পারো না, পিছন ঢাকার কাপড় যোগাতে পারো না। আর আমি বছর বিয়ানী হতে পারব না।
মঙ্গল নেশা করতো। সারা দিনে যা ক'টাকা রোজগার করতো সব ভাটিখানায় দিয়ে আসত মঙ্গল। বউ মুখ ঝামটা দিত। তিনটে খুকি চেয়ে চেয়ে মঙ্গলকে দেখত। মঙ্গলের ইচ্ছে করতো গলা টিপে শেষ করে দেয় তিনটে খুকীকে।
কিন্তু মদের ঝোঁকে উঠতে ইচ্ছে করত না।
রাত গড়ালে বউয়ের আঁচল এর খুঁট থেকে পয়সা চুরি করত মঙ্গল। সকাল হলেই দৌড়ে ভাটি খানায়। একবার রিক্সাটাই চুরি হয়ে গেল মঙ্গলের। থানায় যাবার সাহস ওর ছিল না। অজ্ঞাত কুল শীল চোরের বাপান্ত করল সে প্রাণ ভরে। শনির থানে গিয়ে কপাল ঠুকে রক্ত বের করে ফেলল মঙ্গল। তবু রিকশা ফেরত এল না। রাগের চোটে একপাত্র গিলে ঝুম হয়ে রইল সে। বিকেল হতে মঙ্গল উধাও হয়ে গেল।
ভাড়া বাকি পড়েছে বলে বাড়িওয়ালা তাগাদা দিচ্ছিল কয় দিনই। মঙ্গলের উধাও হয়ে যাবার খবর শুনে তিন তিনটে মেয়ে বাচ্চাকে হাতের নড়া ধরে টেনে বের করে দিল বাড়ি ওয়ালা।
মঙ্গলের বউ একজনের বাড়িতে মেয়েগুলোকে রাখার ব্যবস্থা করলো। দু দিন কাম ধান্ধায় এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে এসে দেখল তিন তিনটে মেয়ে বাচ্চা নড়ে না, চড়ে না। চোখের কোণ গুলোতে মাছি বিনবিন করছিল। খানিকক্ষণ ভোম হয়ে বসে থেকে বউটা হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বস্তির লোকজন সেই শুনে ঢুকে এসে বললো ওরা মরে গিয়েছে।
তিন তিনটে মেয়ে বাচ্চা অনাহারে মরেছে শুনে মিডিয়ার লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল। উন্নতিশীল দেশে মানুষ অনাহারে মরবে কেন সেই নিয়ে সেন্ট মাখা বাবু বিবিরা টিভিতে বস্তির ঝগড়াকে ম্লান করা ভাষায় তরজা শুরু করলেন। মন্ত্রী সান্ত্রী অনাহারে মৃত্যু নিয়ে দোষারোপের পালাগান শুরু করলেন।
সবাই নিজ নিজ অস্তিত্ব জাহির করলো। শুধু মঙ্গলকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন