বোধিবৃক্ষ ছুঁয়ে এক চিরভিক্ষুক : বাবলি সূত্রধর সাহা

অমিত কুমার দে
বোধিবৃক্ষ ছুঁয়ে এক চিরভিক্ষুক : বাবলি সূত্রধর সাহা

বোধিবৃক্ষ ছুঁয়ে এক চিরভিক্ষুক
অমিত কুমার দে
প্রকাশনা- এখন ডুয়ার্স

     ফিরে আসবে বলেই তো বোধিবৃক্ষ ছুঁয়ে আছে তোমার ভিক্ষুক। সত্যিই তিনি বোধিবৃক্ষ ছুঁয়েই মহানির্বানের পথে পা বাড়িয়েছেন। তিনি আর কেউ নন, আমাদের উত্তরবঙ্গের ছন্দের যাদুকর, চিরসবুজ কবি অমিত কুমার দে। পেশায় তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হলেও চার দশক ধরে তাঁর কবিতার সাথে বসত। ডুয়ার্সকে এত সুন্দর ভাবে কেউ আপন করে নিতে পারে অথবা উত্তরের মাটিতে অক্ষর চাষ করতে পারে এমন কবির অসামান্য উদাহরন। সাহিত্যকে যাঁরা ভৌগোলিক সীমানায় বন্দি করতে চান, তাদের বোধহয় এবারে এই কবিতার খনিতে ডুব দিতেই হবে। নাহলে কবি কি করে লেখেন!  আমি চাইতেই ধর্মতলায় চাঁদ সমেত বসে পড়ল চা বাগান, অথবা আমি কলকাতায় এলেই মহানগর ডুয়ার্স হয়ে যায়।

একটা দুটো নয়, একেবারে তিনশ পঁয়ষট্টিটি কবিতা। প্রতিদিন তিলতিল করে যে অক্ষরকে তিনি নির্মাণ করেছেন তারই ফলশ্রুতি এই কবিতার সংকলন। একসাথে এত গুনের সমন্বয় সাধন যাকে বলে অলরাউন্ডার বা মাল্টি কোয়ালিটি ম্যান, তিনি কবি নিজেই। যেমন ছন্দ খেলেছে প্রতিটি রন্ধ্রে - দু হাতে জড়িয়ে মাটি ভালোবাসা চায়, সহজবর্ণ খুঁজে মাটিতে বসায়, আনত প্রনত হয় মৃত্তিকার পা-য়। সাতশ তিরিশ দিন মাটিকেই চায়।

আবার অন্তমিল গদ্যে তিনি সহজিয়া ভাবনার গভীরে ডুব দিয়ে লেখেন - তুমি থাকো দরবেশ বুকের ভেতরে -
কালাচাঁদ, এই দেখ আমিও তোমার মতো সবহারা এক দরবেশ.....। মানস প্রেম যে ত্যাগেও মহান হয়, সেই ত্যাগের আগুনে জন্ম নেয় কবির মানস কন্যা রাজেশ্বরী।তিনি লেখেন পরমান্ন দাও রাজেশ্বরী।তোমাকে পুজো করে আজ আমি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছলাম অথবা পুনরায় আশ্রয় হও, রাজেশ্বরী পেতে দাও তোমার অলৌকিক শীতলপাটি।

রাজেশ্বরী তাঁর স্বপ্নই হোক বা বাস্তব হোক, তাকে ঘিরেই সবুজ ডুয়ার্সের ঘরকন্যা  কবির। এত জটিল যান্ত্রিক জীবনের মধ্যেও তিনি ভালোবাসাকে গভীর মমতায় বেঁধে রেখেছেন। তোমাকে প্রণাম করতে ইচ্ছে করল ভোরবেলা- রাজেশ্বরী ১৫৬ পৃঃ
একই সাথে লিখেছেন আমার মা হও রাজেশ্বরী। শরীরে দাও ঈশ্বরের আলো।
বাবলি সূত্রধর সাহা
জলজ সুবাস ছড়িয়ে উত্তরের নদীরা স্ব-মহিমায় বয়ে চলেছে। আংরাভাসা নদীর জলস্রোতে কবি নিজের অভিমান লেখে। সহজিয়া জলস্রোতে নিজেকে জমা রেখে বলেন- আমাকে ভাসায় নদী, নিয়ে চলে শিকড়ের দিকে।  " বাংলা ভাষায় বলে ওঠে তোমাকে মেঘনা বলে ডাকি, তোমাকে পদ্মা বলে ডাকি কারন এ নদী বাংলায় বয়। আমাদের কান্নায় মিশে থাকে আব্দুল গফফর। বোধিবৃক্ষের প্রতিটি পাতা যেন চিরকালীন, কবিতাগুলোও কালোত্তীর্ণ হওয়ার দাবী রাখে। 

বাংলা সাহিত্যে এই প্রচেষ্টার কোন তুলনা নেই। ইতিমধ্যেই কবির দুটো সংকলন প্রকাশিত হয়ে গেছে। তৃতীয়টা প্রকাশের অপেক্ষায়। কবির স্বপ্ন আছে মোট পাঁচটি সংকলন করার। যাতে আমরা পাঠকরা আরও সমৃদ্ধ হতে পারি। এছাড়া ভবিষ্যতে কোন আগ্রহী কবি বা পাঠক এই কবিতা সংকলন নিয়ে গবেষনায় রত হতে পারেন। অভাবনীয় উদ্যোগ, সুখে বা অসুখে হোক তিনি প্রতিদিন লিখছেন একটি করে কবিতা। এর আগে কেউ এতটা দুঃসাহস দেখাতে পেরেছেন কি না জানিনা। লোডশেডিং এর মধ্যেও তিনি লেখেন কোথাও কোন বাতি জ্বলছেনা রাজেশ্বরী, শুধু জানালা দিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে চাঁদ। ডুয়ার্সের বৃক্ষ ব্যাকরণে একাকী অরণ্য হই কোন এক নির্জন ভূখণ্ডে।

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর দাপটে সবুজ ডুয়ার্সেও আজ বিভীষিকার হাতছানি। তবু সবুজ বনজ চাঁদের আলোয় আদিগন্ত ভেসে যাবে আর আলোর ঢেউয়ে লেগে থাকবেপাতার রেখা। কবি যেখানে তাঁর রোমান্টিসিজমের জারকে কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখেন দীর্ঘ পর্যটনের মাধুকরী সাজিয়ে অক্ষর বিন্যাসে লিপ্ত থাকেন তখন কোন লোভ তাকে ছুঁতে পারেনা। ছন্দে কবির দখল অসামান্য সাথে গদ্যের ব্যাকরণেও তিনি সমান পারদর্শী।

একটি গবেষণা মূলক পত্রিকা৷ "চিকরাশি"র সম্পাদক কবি। উত্তরের সফল কবিদের কাব্যগ্রন্থ গবেষণা এবং তাঁদের চিকরাশি সম্মাননা দিয়ে চলেছেন গত কয়েক বছর ধরে। তাঁর রাজেশ্বরী সিরিজ তুমুল জনপ্রিয়। এছাড়া হাত বাড়ালাম ধরো, বৃষ্টি আমায় নিবি,   পঞ্চাশ পর্যটন শেষে মাধুকরী ধান উল্লেখযোগ্য।
সময়ের ক্লেদ কবিকে কষ্ট দেয়। নিজের কর্মফল খোদাই করেন তিনি ঘাসে। নিজের ক্ষুদ্রতা দেখতে গিয়ে আকাশের ফাঁকিও তিনি ধরে ফেলেন। কি নিদারুন দক্ষতায়  একে একে সাজিয়ে তোলেন জন্ম মৃত্যুর কথামালা- একখানা জন্মকে ছুঁয়ে দেখতে না দেখতেই আরো একটা গহনের কাছে সমর্পনের পরপরই আবার অতল খোঁজের টান।( শেষ নেই)।  "  যতবার ফিরে আসা ততবার নিজেকে পুনর্নিমাণ"
মৃত্যুর পাশেও অসংখ্য কথা থাকে।( ফেরা)।  চারপাশের গভীর সংকটে সবাই যখন উদভ্রান্ত, অসহায়, সেই সময়েই তিনি লেখেন- এই দেশটাই কি ভারতবর্ষ!!? কেউ উত্তর দিল না। ( নিরুত্তর)। 
জন্মজন্মান্তর নিয়ে এই যে ওঠা নামা, সুরের স্বরলিপি, এত শব্দের ভাঙা গড়া আশ্চর্য রকম ভাবে কবি তুলে ধরেছেন এই বইটিতে।

মাটির গভীরে মেশা তাঁর পূর্বজন্ম, মায়ের অনিচ্ছা আঁকা জন্মকুন্ডলী তালগোল হয়ে থাকা কত প্রত্যাখ্যান (শেষ কবিতা ৭৩০)। চিকরাশি, ঝিরঝির পত্রিকা সামলে নিয়েও কবি নিরন্তর চাষ করে চলেছেন শব্দের। আমাদের উত্তরের এবং ডুয়ার্সের ছন্দের ম্যাজিসিয়ান মানেই অমিত কুমার দে। কিন্তু এই সংকলনটি না পড়লে বোঝা যাবে না, তিনি গদ্য কবিতাতেও সফল। তাঁর প্রতিদিনকার লেখা নিয়ে এই যে কবিতা কার্নিভাল একে সম্মান জানাই। তাঁর নিজস্ব বসতে চলুক কবিতার যাপন।
ঈশ্বরকে কখনোই বলতে নেই,কষ্ট পেয়ো না। ঈশ্বর হেসে উঠবেন বলেই সমস্ত কিছুর পরও তুমও বিশুদ্ধ হও পুনরায়।( ঈশ্বর পর্ব)।
কবির সুস্থতা প্রার্থনা করে এটুকুই বলা যায় " ভালোবাসা না থাকলে সব স্পর্শ অর্থহীন হয়"।
বোধিবৃক্ষ ছুঁয়ে এক চিরভিক্ষুক।
অমিত কুমার দে।
ধূপগুড়ি
প্রকাশনা- এখন ডুয়ার্স
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.