নীল বাতি : সোনালী মুখার্জী

নীল বাতি : সোনালী মুখার্জী

 নীল বাতি : সোনালী মুখার্জী

ঘরের নাইট লাম্পে নীল আলো টা তখনো জ্বলছিল।আজ কি অনেকটা দেরি হয়ে গেল উঠতে??তাড়াতাড়ি ঘড়ির দিকে তাকালো সুপর্ণা.7 টা বেজে 20 মিনিট...উঠেই বাথরুম এর দিকে ছুটলো ও।আর একটুও নষ্ট করার মতো সময় নেই ওর হাতে।8 ,20 র লোকাল টা ধরতে না পারলে কিছুতেই 10 টার আগে অফিসে পৌঁছতে পারবে না..ওদিকে বস এর হুকুম..মিটিং 10 টা তেই শুরু করতে হবে।অগত্যা.....

বিকালে অফিস থেকে বেরোতে পৌনে ছটা বেজে গেল..ক্লান্ত পা দুটোকে টেনে আস্তে আস্তে বাস স্টপ এ দাঁড়ায় সুপর্ণা..একটু দুরেই ওই লাল চেক শার্ট পড়া ছেলেটা বিকাশ না???হ্যাঁ বিকাশ ই তো..সুপর্ণা নিজের মনে সগোক্তি করে..কতদিন পরে যেন ওকে দেখলো???14 বছর..হ্যাঁ ঠিক 14 বছর তিন মাস চার দিন পরে..কিন্তু ও কি দেখতে পায় নি ??ভাবে যাবে ??ওর কাছে??পরক্ষনেই মত বদলায়..কি দরকার??আর নাই বা পিছন ফিরে তাকানো....

বাড়ি ফিরেও কিছুতেই বিকাশ কে মন থেকে সরাতে পারে না ও..মনটাও বড় ভারাক্রান্ত...যখন থেকে বিকাশ কে দেখেছে কি এক অবক্ত যন্ত্রণা সারা মনে ছড়িয়ে আছে..রাতে প্রায় কিছুই না খেয়ে শুয়ে পড়লো সুপর্ণা..আবার ওই নীল লাম্প সারা ঘরে আলোর শিখা ছড়ালো ..আর ও ফিরে গেল ফ্ল্যাশব্যাকে সেই অতীতের দিনগুলোতে...

সেদিন কলেজের করিডোরে টিয়া ছন্দা চন্দন ও পূর্ণা বাপ্পা সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিল..হঠাৎ একটা ছেলে এগিয়ে এলো আর এসেই সুপর্ণা কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলো,তুমি সুপর্ণা??তোমার সাথে আমার একটু দরকার আছে,একটু এদিকে এস তো???সুপর্ণার সাথে ওর বন্ধুরাও হটাৎ একটা অচেনা ছেলের এই ভাবে ডাকাতে হকচকিয়ে গেছে..কিন্তু ছেলে টা কোনো কিছুই তোয়াক্কা না করে আবার সরাসরি সুপর্ণা কে বললো ...বললাম যে??দরকার আছে??ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সুপর্ণা যেন খেই হারিয়ে ফেললো..কি উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টি,সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাটা মনে উঁকি দিলো...(তোমার চোখে দেখে ছিলাম আমার সর্বনাশ)..কিছুই আর বলা হলো না।মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর পিছনে চলল সুপর্ণা..একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে ছেলে টা সুপর্ণা কে বললো ,আমি বিকাশ।বিকাশ ব্যানার্জী।থাকি হাওড়া..আমার এই কলেজে এবার ফাইনাল ইয়ার.. বাবা মার একমাত্র সন্তান..তুমি তো সুপর্ণা??সুপর্ণা চ্যাটার্জী??তোমার ব্যাপারে সব খোঁজ নিয়েছি আমি..এবারের নতুন ব্যাচ তুমি..যাই হোক শোনো আমি যা বলি সামনাসামনি,তোমায় প্রথম দেখেই আমার ভালো লেগে গেছে..হয়তো এই কদিনে ভালোবেসেও ফেলেছি..আমি তোমার মত জানতে চাই...সুপর্ণা কিছুই বলতে পারলো না..কি করে বলবে??ওর মনটাও তো ভালোলাগায় ভরে যাচ্ছে,মনের পাপড়ি রা যে ডানা মেলছে নীল আকাশে??বিকাশ বলল কাল আমরা কলেজের পিছনের মাঠে ওই কৃষ্ণচূড়া গাছ টার নিচে দেখা করবো।এখন আসছি...বলেই বিকাশ সুপর্ণার কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই হাঁটতে লাগলো,আর সুপর্ণা বোকার মতো ওর দিকে তাকিয়ে রইলো...

এর পর থেকে প্রায়ই ওদের দেখা যেতে লাগল কখনো ওই কৃষ্ণ চূড়া গাছের নিচে..কখনো ক্যান্টিনে,কখনো সিনেমা হলে, কখনো লং ড্রাইভে ,দুজনে যেন ভেসে যাচ্ছিল হওয়ায়,বলা ভালো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বিকাশ সুপর্ণা কে...

এর মধ্যে জল অনেকদূর গড়িয়েছে।বিকাশ পাস করে একটা ভালো কোম্পানিতে জয়েন করেছে..এদিকে সুপর্ণার ও পড়া শেষ..বাড়িতে দেখাশোনা আরম্ভ করার তোড়জোড় চলছে..সুপর্ণা আর উপায়ন্তর না দেখে মাকে সব ঘটনা খুলে বললো..ওর মা ওর বাবা আর দাদার সাথে আলোচনা করে বিকাশ কে ওদের বাড়ি আসতে বললো...
বিকাশ এলো, একা, ওর বাবা মা আসতে পারেন নি,ওনারা দিল্লি তে থাকেন,এখানে ও একাই থাকে,আর বিয়ে র সব কথা ও একাই বলতে চায়,ওর বক্তব্য অনুযায়ী ও আর সুপর্ণা দুজনে সংসার করবে,বাবা মা নয়,অতএব ওনারা না এলেও কোনো অসুবিধা নেই,শুধু আশীর্বাদ এর সময় থাকলেই হবে..এটা সুপর্ণার বাবা মা দাদা কারোর ভালো না লাগলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তেমন কিছুই বললেন না....

যায় হোক,সমস্ত পাকা হয়ে গেল বিয়ের,বৈশাখ মাসের দশ তারিখে বিয়ের দিন ঠিক হলো,।বিয়ের দিন সকাল থেকে বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন এ বাড়ি গমগম করছে..তারই মধ্যে গায়েহলুদ এসে পড়লো,সারা দিন নানা ব্যাস্ততা আর হৈহৈ এর মধ্যে দিয়ে এসে গেল সেই ক্ষন, লাল বেনারসী আর চন্দনের ফোঁটা য় সুপর্ণা আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়,এত রূপ তার??মনে মনে হাসে,বিকাশের কথা ভাবে, ও তো এই রূপেই পাগল....
বিয়ে শুরু হয়ে গেছে,চারিদিক সানাই শঙ্খ উলুধ্বনি র আওয়াজে সারা বাড়ি মেতে আছে। সব অনুষ্ঠান শেষ ,এবার শুরু হবে কুসুমডিঙে..এবার সিঁদুর দান,সিঁদুর পড়বে সুপর্ণা,মনের ভিতর উথাল পাথাল হচ্ছে,কতদিন স্বপ্নে এই দিনটা কল্পনা করেছে ও,নিজের প্রিয় পুরুষটির হাত থেকে সিঁদুর নিয়ে সিঁথি টা রাঙা করে নেবে,ভাবতেই শরীর টা কাঁটা দিয়ে ওঠে...

হঠাৎ এত চেচামেচি হইহই কিসের??ভিড়ের মাঝে কিছুই দেখতে পায় না সুপর্ণা..তার পরেই দেখে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসছে একদল পুলিশ ,সঙ্গেএকজন বিবাহিতা মেয়ে,আর কোলে বছর খানেকের একটা বাচ্চা,তারা এসে দাবি করে তারা বিকাশের স্ত্রী এবং পুত্র...এত হৈহৈ  চেচামেচি র মধ্যে সুপর্ণা হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে,আর কিছুই তার মনে থাকে না...
জ্ঞান ফিরে সে দেখতে পায় বিয়ে বাড়ি স্বশান হয়ে গেছে, আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কেউ কোথাও নেই, শুধু মা বাবা আর দাদা পায়ের কাছে বসে নীরবে চোখের জল ফেলছে...

এর পর সময় এগিয়ে চলে তার মতো ,না অনেক বলার পরেও সুপর্ণা আর বিয়ের পিড়ি তে বসে নি,একে একে বাবা মা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন,আর দাদাও বিয়ে করে সুখী,সুপর্ণা নিজেও একটা প্রাইভেট কোম্পানি তে ভালো পোস্ট এ চাকরি করে,এখন একাই থাকে।
না আর কখনোই সে মনের আলো জ্বালাবে না,যে আলো বিকাশ ভালোবাসা দিয়ে জেলে প্রতারণা দিয়ে নিভিয়ে দিয়ে গেল,তাকে আর কখনো কিছুতেই জ্বলতে দেবে না সুপর্ণা,, কিছুতেই না,, কিছুতেই না.....
Share on Google Plus

About Shraboni Parbat

This is a short description in the author block about the author. You edit it by entering text in the "Biographical Info" field in the user admin panel.