| রুদ্রসাগর কুন্ডু |
এক
শীত শেষ। আরব্ধ কুর্ণিশ জানায় বসন্তের ঝরা পাতা
হাতে এসে গুড়িয়ে যায় শুকনো অভিসন্ধির সন্ধেবেলায়
পতনের শব্দময় কবিতারা তখন, অঙ্গনে নিবিড় ঘুমায়
তুমি নারী, অপসৃয়মান গোধূলির মত আরক্তিম
বসন্তে, কবিতার পঙক্তিমালার মত অলস পড়ে আছো
শীতের-শেষের প্রসন্ন বিকেল হয়ে
তোমার জানা নেই...
দীঘি শৈবালের কথা জেনেছি শুধু আমরা। উদ্ভিন্ন আলো
এমনকি ঈর্ষায় পাথর-ক্ষয়িত মানুষ দেখেছি; কী অম্লান!
যে-সব ইশারায় পৃ্থিবীর বার্ষিক গতি জানে মানুষেরা
তাতে প্রতিয়মান হয়, মানুষ জানে, বদলের ইতিহাস ...
শুধু রমণী-বৃত্তের কলা ও ধ্বনি,
শিল্প ও সুষমা জ্ঞানের অভাবে,
পুরুষের জানা নেই, নারীর গতি ও প্রকৃতি, গোপন বিস্ময়
দুই
অক্ষাংশ রেখার মত আলোকপাত করেছিলে আমায়
একা-পথে, একা এক নিবিষ্ট ছায়া
কালান্তরের পথে জেগেছিলে, ঝিঝি-পোকার মতো
তবু, পেরিয়েছি মীমাংসার ঐক্য-পথগুলো ...
অরণ্যের পথে পথে কেটেছে যুদ্ধক্লান্ত দিন,
ন্যুব্জমানুষ দেখেছি সেই পথে, তারা জীবনের কাছে
দীর্ঘ রক্তপাত জমিয়ে রেখেছে মাটির কলসে
ভাঙিনি সেই স্নিগ্ধতা; বিনোদন প্রণালীর প্রস্তুতি।
তেপান্তরের মাঠে আমাদের সমর্পণ
একান্ত প্রশস্তি-প্রহরা ভেঙে বুকের ভিতরে ছায়াপথ
ফুল ছোয়ালেও কংকাল ভেঙে চুরমার যেন
তখন আমার অতীব শোকাবহ দিন
তীব্র নখরে প্রতিবার হেসে উঠেছে চুপিচুপি অন্ধকার
আর, তুমি শুয়ে ছিলে রতি-নিমগ্নতায়, দূরে কোথাও
তিন
জেনেছি করোটির গঠন, এনাটমি, এনামেল, স্ফটিক লুব্ধতা
কোমর দুলিয়ে গেলে গতি পায় শরীরের বাঁক, বাঁকে বাঁকে জল
চৌকস চোখের মাদকতায় শুয়ে থাকা কালান্তর পেরিয়ে এসে
শিল্পের মত জড়িয়েছ পুরুষের বাহু
জড়াও শরীর। জড়াও আকুল শীৎকারে শরীরের ভাঁজ
প্রকাশের পল্লবে নদী পেরিয়ে আসা ক্লান্ত
উদাস হরিণ জানে, অস্তমিত বহুদিনের আলোতে কত ভয়
এইভাবে, অবাধ্য হিম ছোঁয়, পাখির খুলে রাখা মনের দুয়ার
আর আমার অবসন্ন দিনলিপি খুলে উড়ে যাচ্ছিল অক্ষরগুলো
চার
কুরবর্ষ থেকে গভীর গ্লানির উৎস ছিল আমাদের রক্তে
রক্তকোষে ইতিহাসের আলোড়ন ছিল।
অন্তঃকরণে দীপ জ্বেলে রাখা সমুদ্র-পাখির ডানায় শুয়ে নীল হয়
আকাশের নিকট সব প্রাণ সমুদ্রের ঢেউ...
তুমি জান না সব, বুদ্ধির কঠিন উৎসবে ঢের জমে আছে
অস্তসুর্যের কল্লোল
উজ্জ্বল প্রশান্তি
বজ্রবাতাস জানে, দ্যোতনাময় প্রান্তরে শোকাবহ থাকা উন্মুলিত
পরাগের উৎসতাপ, রমণীর শারিরীক পুষ্টিঘ্রাণ
হেমন্তের বিহ্বল দুপুর, নমিত পাহাড় বনানী, পুরুষ-মননশীলতা
নিরত্তেজ শব্দের বিমুগ্ধতা
উৎসবের তরঙ্গ ; সব জানো, সবকিছু জানো নারী,
জানো না শুধু, আহত কবি ও কবিতার এনামেল
তুমি জান না মহীয়সী, শরিরের দীর্ঘতা, ছন্দরূপ, ব্যথিত আর্তনাদ
পাঁচ
সাম্রাজ্য চাওনি তুমি, ভূমি উৎস থেকে সূর্যরঙ
চাঁদ থেকে গৃহস্থ সামিয়ানা
আমার হৃদয় চেয়েছ প্রেমের অক্ষরমালা-সহ
আর বনেদি এই বিস্ময়ের রাতে
মৃগদের দ্রুত দৌড়ের লুপ্ত ইতিহাস
সবুজমাঠ লাল দিগন্ত-সহ চেয়েছো যুদ্ধ-বিগ্রহ
চৈত্র বাতাসে নির্নিমিখ দেখেছ মাঝরাতের নির্জনতা
খোলসে ডুবে ছিলাম পরিজন অসুখের ঘরে
রক্তক্লান্ত নাবিক, উল্লাসে প্রসারিত হাতের তালু
স্ফটিক রৌদ্রে পুড়ে গেছি মেধাবী নীলিমায়,
ছুঁয়েছি উদ্ভিদ, মাটি, মাংস-ধূসর
তোমার স্তন, নাভিদেশ, ঊরুর পরিসর বিমুগ্ধতা
ছয়
সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যায়। ভালোবেসে আলোও একদিন
আরক্তিম স্বর্গের পাশে নাগরীক অন্ধকার রাখে
যৌনকুয়াশায় দেখতে পাইনি মুখ, সংগোপনে
জলকণার মত সূর্য স্রোত, আর জনপদ সভ্যতায়
অন্তিম হরিৎ হয়ে এল আমাদের সমাগম
আলো ছিলে তুমি, তুমিই ছায়া। সন্ধানের বিস্ময়ে
রৌদ্রনীল শ্যামল ছড়াতে আধিপত্যের শরীরে
মসৃণ নারীর শরীর ছুঁয়ে
সারারাত শুয়ে ছিলাম মন্বন্তরে, মানুষের ভিড়ে
হঠাৎ নামা বৃষ্টির ভিতর অচেনা তোমার মুখ
একান্ত জেগে ছিলে দেবদারু গাছের মত
স্বপ্নের ভিতর কারা যেন বেহালা বাজায়
কালের কিনারে আজ আর উজ্জ্বলতা নেই
পৃথিবীর পাখি, অন্তহীন আগুনে পুড়ছে পুনরায়
গতি নেই। বিনাশের তীরে বিকেলের ম্লান আলোয়
প্রকৃতি ঘুমায়-- রীতির ভিতরে, প্রবাহের ভিতর ...
সাত
পরাস্ত সূর্যের মত আছড়ে পড়ছি মলিন চেতনায়
অস্তমিত আলোর পাশে তুমি শুয়ে থাকলে
একটানা ডেকে যায় কোকিলের বিরহ গান, ফুলের
উন্মুল সব অরণ্য প্রভাতে জেগে ওঠে
ঘুমন্ত গাছের অরুণ প্রভাত, মুখশ্রী, গ্রীবা ভঙ্গিমা
অবিশ্রান্ত বর্ষণের দৃষ্টিঘোর অমানিশায়
একটি পরাস্ত মৌমাছি গহিনের রতিকলা ও নিমগ্ন
যৌনরীতির ইতিহাস ফেলে গেছে অনার্য আগুন জ্বেলে
অন্ধকার নামছে সন্ধের উঠনে, সেখানে অভিঘাত
মৌন বকুলের সিরসির, হাওয়ায় লুকোবার মত ...
তুমি জান না মেয়ে, বিরাজিত মেঘের ভিতর, বর্ষা
লুকিয়ে ঘুমায়, পুরুষের ঘুম পরাস্ত সূর্য, যৌন বিরতির
মত শুনশান, উপেক্ষিত আলেয়াহ্রদের দিনলিপি
আট
এভাবে আরও ইতিহাস উন্মত্ততা। একান্ত যাপনের
কিনারায় দারিয়ে খুঁজেছি সমুদ্রের প্রসারিত বাহু
নুলিয়ার স্নিগ্ধপালকের দ্রুতগতি, শব্দের গোপন আলো
প্রতিফলনের আরক্তিম জমিয়ে রাখে ক্লান্তিকর
অমানিশায় – প্রলুব্ধ ইঙ্গিতগুলো নশ্বর হয়ে যায়
প্রতিফলনের ঈর্ষায় ডুবে যায় সমাহিত জরুলের পাতা
তোমার ক্লান্তিকর শরীরের খাদে নেমেছি একা একা
তোমার উষ্ণতায় পুড়েছি নিভৃতে
জারণরেখার মত আয়ুধ ও কৌশলে
এই আমি প্রতিদিন লজ্জার বাহুতে ডুবে মরি
ইস্পাতের ঝনঝন, বাতাসের শোকাবহ বারতায়
নৈঃশব্দ্যের আর্তি ও উপহাস, আমাকে বিদীর্ণ করে!
নয়
এইসব ম্লান কথা তোমার জানার নয় কোনও কালে
তবু এই অমোঘ জ্যোৎস্নায় আবিল হয়ে আসে
শরীরের ভেজা উর্বর, কোজাগর উন্মাদ কলকাকলি
অরণ্যের গভীর ছায়ার ভিতর জাগিয়ে রাখে আমায়
বেদনা-বাহিত ডাহুকের চিতকারে ঘুম ভাঙ্গে
দেখি, পূবাকাশে আহ্লাদি নীল, হাস্যস্নাত মুখে
আবিরের লজ্জা মাখে উড়ে যাওয়া বলাকার গায়
কবির মুখে জেগেছিল মৃত্যুর ঘুমন্ত পথ
নগরের সব কবি একদা এইসব যত্নে রেখেছে তুলে
স্মৃতিকথনের জ্যোৎস্নায় আবিল-মন্থর-ঘাস, অনায়াসে
পূরবীর কোলে মাথা রেখে শোয়। এই নশ্বরতায়
দশ
এইভাবে পেরিয়েছি কালান্তর দুপুরের রৌদ্র-ঝলমল
শরীরে উত্তাপ লুকিয়ে রেখে বন-মর্মর বয়সীবৃক্ষের,
পাতা ঝরে ঘুমিয়ে থাকা মাটি জাগে বহুদিন-পর--
এই উত্তাপ কুরে কুরে খাবে, আদিম বনবাসিদের...
আর আমার ভাবনার ইতিউতি বেঁকে গেছে একা
সীমানার বেড়া ভেঙ্গে। জান নি সেই মৃত ডাহুকের,
পালকে পালকে লেখা রক্তের ইতিহাস ধুয়ে গেছে--
এক দুপুর নির্জনতার ভিতর প্রাচীনতম দুঃস্বপ্নের!
হায় চিল, শঙ্খচিল ডেকেছে যতবার দুপুর আকাশ
রোদে ভেসে যায় সোনারঙ-ডানা রৌদ্র করজ্জল
সুপর্ণা, তুমি জাননি এই বিপদের ভাষা ও জন্ম ;
গভীর বনের ভিতর, জেগেছিল আক্রোশে করতল।
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন